পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের ইসলামপুর ও দক্ষিণ চরপাড়া এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন এবং সংযোগ দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি রিয়াজ সিকদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, অর্ধশতাধিক পরিবারের কাছ থেকে পরিবারপ্রতি দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। পরে বিদ্যুৎ মিটার সংযোগের জন্য আরও দুই হাজার টাকা দিতে বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
স্থানীয় সূত্র ও বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামপুর ও দক্ষিণ চরপাড়া এলাকার শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে ছিল। ফলে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ নেওয়ার খবর এলাকায় স্বস্তি তৈরি করে। সম্প্রতি পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনায় অনেক পরিবার আশাবাদী হয়ে ওঠে।
তবে কাজ শুরুর পরই অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে আসে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বিদ্যুতের খুঁটি পরিবহন ও স্থাপনের শ্রমিক খরচের কথা বলে পরিবারপ্রতি দুই হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর বাইরে মিটার সংযোগের জন্য আরও দুই হাজার টাকা দিতে হবে বলে কয়েকজনকে জানানো হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই অর্থের পরিমাণ কম নয়। অনেকেই বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে কিংবা সঞ্চিত অর্থ থেকে টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন বিদ্যুৎবঞ্চিত থাকার কারণে সংযোগ পাওয়ার সুযোগকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। সেই সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় অনেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেও দ্বিধা করেছেন। কারও অভিযোগ, টাকা না দিলে কাজ বিলম্বিত হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।
নাসির উদ্দিন নামে এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, তার বাড়ির পাশে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপনের সময় নির্ধারিত টাকা দিতে না পারায় খুঁটিটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে রাতে এক হাজার টাকা দেওয়ার পরদিন তার বাড়ির সামনে খুঁটি স্থাপন করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। তার এই বক্তব্য স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিঠাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি রিয়াজ সিকদার। মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। তবে শ্রমিকদের খাবারের জন্য কিছু অর্থ নেওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। বাকি অভিযোগগুলোকে তিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুতের সাব-ঠিকাদার সুমনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, গ্রাহকদের কাছ থেকে রিয়াজ সিকদারের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। এই বক্তব্যের কারণে অর্থ সংগ্রহের ধরন, উদ্দেশ্য এবং অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয় যাচাইয়ের প্রয়োজন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কলাপাড়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ অভিযোগটি রাজনৈতিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে কলাপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম শেখ আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনের কাজ চলছে। এ ধরনের কাজে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
বিদ্যুৎ সংযোগের মতো মৌলিক নাগরিক সেবাকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত কোনো কাজের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলে সেই অর্থ কোন খাতে, কার অনুমোদনে এবং কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো যদি প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করবে। একই সঙ্গে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যেসব পরিবার অর্থ দিয়েছে, তাদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থাও করার দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিদ্যুৎ সংযোগের সরকারি কাজের সঙ্গে কোনো অর্থ সংগ্রহ যুক্ত ছিল কি না এবং থাকলে সেই অর্থের বৈধতা কী। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হলে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং দীর্ঘদিন বিদ্যুৎবঞ্চিত পরিবারগুলোর সংযোগ পাওয়ার প্রক্রিয়াও স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

