বিরোধী কর্মসূচির আবহে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে বিএনপি

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতাকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্রের দাবি, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠের কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশকে বিএনপির অভ্যন্তরে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির পাল্টা রাজনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, অন্য কোনো দলের কর্মসূচির চাপে পড়ে তারা মাঠে নামেননি। বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেওয়া, নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা এবং আওয়ামী লীগের তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকাই এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিএনপির ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দল আগে থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির মতো বিষয় নিয়ে কর্মসূচি পালন করে আসছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাদের আন্দোলনের তালিকায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যোগ করেছে।

সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে জোর বিএনপির

বিএনপি সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার জন্য জেলা ও মহানগর ইউনিটগুলোকে আরও বেশি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যেসব বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে, তার কিছু দলীয়ভাবে আগাম ঘোষণা না দিলেও এগুলোকে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানানোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগের নেতাদের সঙ্গে একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছে বিএনপি। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত মৃধা অংশ নেন।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও শিগগির বৈঠক হতে পারে। এতে দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নিতে পারেন। এসব বৈঠকে মাঠের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ড আরও সমন্বিত করার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।

বিরোধী জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি

বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর সময়েই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চ করে জোটটি।

এসব কর্মসূচিতে জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারসংকটের সমাধান, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো বিষয় উঠে আসে। ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর কর্মসূচির আগে জোটটি তাদের দাবির তালিকা আট দফায় উন্নীত করে। এর মধ্যে ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার, জ্বালানি ও সারসংকটের অবসান এবং নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ।

জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে সরকার জনগণের দাবির বিষয়ে চাপ অনুভব করছে। তবে এই বক্তব্য বিরোধী জোটের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সরকার পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে, তা আলাদাভাবে বিবেচ্য।

জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন রাজনৈতিক ইস্যু

এর মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর দেশের চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। তাদের বক্তব্য, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে কৃষি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

সরকার অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝার কথা বলেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দেশে জ্বালানির দাম কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকির কথাও সরকারি ব্যাখ্যায় এসেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে সরাসরি পড়ে। জ্বালানি পরিবহন ও উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান হওয়ায় এর দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন, কৃষি সেচ এবং শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অক্টোবরেও বহাল বাড়তি দাম

সেপ্টেম্বরে এক দফা বড় মূল্যবৃদ্ধির পর অক্টোবর মাসে নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অক্টোবরজুড়ে ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হবে।

ফলে সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অক্টোবরেও বহাল থাকছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কিছুদিন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

‘চাপের কারণে নয়’, বিএনপির বক্তব্য

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে ডিজেলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য লোকসান বা ভর্তুকির চাপ বহন করতে হচ্ছে।

বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে রিজভীর বক্তব্য, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে বিএনপি চাপ অনুভব করছে—এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাঁর দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও প্রচারের জবাব দেওয়া এবং জনগণের সামনে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করতেই দলটি মাঠে সক্রিয় হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়েও বিএনপির নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ এবং বাস ও ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এসেছে; পৃথক ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়।

জামায়াতের ব্যাখ্যা আলাদা

জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বিএনপির ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের বক্তব্য, জ্বালানি সংকট সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ের জন্যই সমস্যা। তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো একটি দলের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা নয়; বরং সমস্যার সমাধানে সরকারকে উদ্যোগী করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা।

এ অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। জ্বালানি মূল্য, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মতো সরাসরি জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো এখন রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে।

বিএনপির জন্য পরিস্থিতিটি একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাঠের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নতুন একটি অর্থনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট তাদের ঘোষিত দাবিগুলো নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা বলছে। ফলে সামনে রাজনৈতিক বিতর্কের বড় অংশজুড়ে থাকতে পারে জ্বালানি ব্যয়, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে বিএনপির সাম্প্রতিক তৎপরতা শুধু একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রতিক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা, রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করা এবং পরিবর্তিত মাঠের পরিস্থিতিতে দলীয় উপস্থিতি দৃশ্যমান রাখার চেষ্টা। আর বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রাজনীতিকে অর্থনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।