বিরোধী দলের সমর্থকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ, উদ্বেগ প্রকাশ এইচআরডাব্লিউর

বাংলাদেশে বামপন্থি রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সমাবেশে গণ-গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ঘটনাটি বাংলাদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর চলমান ধারাবাহিক দমন-পীড়নেরই একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত।
এইচআরডাব্লিউ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি জাসদের একটি সাধারণ সমাবেশ থেকে প্রায় ২৯০ জন সমর্থককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যুব সংগঠন যুবদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, ওই সমাবেশটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি ‘গোপন বৈঠক’ ছিল। পরবর্তীতে আটককৃতদের মধ্যে অন্তত ২৭ জনকে পুলিশি রিমান্ডে পাঠায় আদালত। তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তারা সেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছিলেন।
সংস্থাটির বিবৃতিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক দল হিসেবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেই সরকারের পতন ঘটে। ওই আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
এইচআরডাব্লিউ উল্লেখ করেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনের সময় তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তীব্র নির্যাতন ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপি নিজেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে একই পথ বেছে নিয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী কারাগারে আটক রয়েছেন, যাদের বিরাট অংশের বিরুদ্ধে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উপস্থাপন বা আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের যেকোনো ধরনের উপস্থিতির ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও গণ-গ্রেপ্তারের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাসদের সভার দিন বরিশালে তথাকথিত ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ ও গোপন বৈঠকের অভিযোগে ১২ জন আওয়ামী লীগ কর্মীকে আটক করা হয়। এর মাত্র দুই দিন পর একই ধরনের অভিযোগে রাজধানীর ঢাকা থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আরও ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুটি ঘটনাতেই আটককৃতরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন ও বিরোধী দলকে নির্বিচারে আটকের ঘটনা ঘটেছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে মানবাধিকার ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সরকারে আসার পর দলটি তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দীদের ঢালাওভাবে আটক করছে এবং পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত বিভিন্ন মানবাধিকার সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ শিথিল বা বাতিল করে দিচ্ছে।
এইচআরডাব্লিউ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশ্বের সব নাগরিকের জন্য স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করেছিল—এই যুক্তি দেখিয়ে বর্তমানে বিএনপি সরকারের একই ধরনের কাজের বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, বিরোধী মতামত দমন ও নির্বিচারে আইন প্রয়োগের এই পুরোনো চক্র শেষ পর্যন্ত দেশকে কোথায় নিয়ে ঠেকায়, তার একাধিক করুণ নজির বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসেই রয়েছে।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।