ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ ভোটে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে শেষ পর্যন্ত এই ভোটে জয়ী হলেও নতুন কোনো ব্যালন ডি’অর ট্রফি পাবেন না তিনি। এমনকি ঐতিহাসিক সুপার ব্যালন ডি’অরও দেওয়া হবে না। সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে পুরস্কারটির আয়োজক ফ্রান্স ফুটবল।
‘ব্যালন ডি’অর অব অল টাইম’ বা সংক্ষেপে ‘বোট’ নামে এই বিশেষ ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। ব্যালন ডি’অরের সাত দশক পূর্তি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সমর্থকদের ফুটবল ইতিহাসের স্মরণীয় ব্যক্তিগত মৌসুম নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আগামী সোমবার, ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এবারের মূল ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান। এর কয়েক দিন আগে বিশেষ ভোট চালু হওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, দীর্ঘ ৩৭ বছর পর হয়তো আবার ফিরতে যাচ্ছে সুপার ব্যালন ডি’অর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকায় আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয় ফ্রান্স ফুটবল। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ভোটের সঙ্গে নতুন কোনো পুরস্কার চালুর সম্পর্ক নেই। বরং ফুটবলের প্রতি সমর্থকদের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলোকে উদ্যাপন করাই আয়োজনটির উদ্দেশ্য।
বিশেষ এই ভোটে জায়গা পেয়েছেন ব্যালন ডি’অর একাধিকবার জয়ী ১০ কিংবদন্তি ফুটবলার। তাঁরা হলেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, মার্কো ফন বাস্তেন, মিশেল প্লাতিনি, কার্ল-হাইনৎস রুমেনিগে, কেভিন কিগান, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার, ইয়োহান ক্রুইফ ও আলফ্রেদো দি স্তেফানো।
তবে এখানে কোনো ফুটবলারের পুরো ক্যারিয়ার কিংবা মোট ব্যালন ডি’অর জয়ের সংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। বরং তাঁদের ক্যারিয়ারের নির্দিষ্ট মৌসুমের পারফরম্যান্সের মধ্যে তুলনা করা হচ্ছে। সমর্থকেরা নিজেদের পছন্দের মৌসুমকে ভোট দিয়ে এগিয়ে রাখতে পারছেন।
এই ভোটের পদ্ধতিও কিছুটা ব্যতিক্রমী। প্রতিটি ভোট দিতে খরচ হচ্ছে এক ইউরো। একজন সমর্থক কতবার ভোট দিতে পারবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়নি। ফলে একই ব্যক্তি চাইলে অর্থ খরচ করে নিজের পছন্দের ফুটবলারের মৌসুমের পক্ষে একাধিকবার ভোট দিতে পারবেন।
এমন ব্যবস্থায় ভোটের ফলাফলকে সমর্থকদের সামগ্রিক পছন্দের নির্ভুল প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। কারণ বেশি ভোট পাওয়া মানেই বেশি সংখ্যক স্বতন্ত্র সমর্থকের সমর্থন পাওয়া নয়।
ভোটের এই ধরন এবং আয়োজনের নাম ঘিরেই মূলত বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘ব্যালন ডি’অর অব অল টাইম’ নামটি দেখে অনেকে ধারণা করেন, এর মাধ্যমে হয়তো ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মাননা দেওয়া হবে।
তবে ফ্রান্স ফুটবল জানিয়েছে, ‘বোট’ সম্পূর্ণভাবে জনগণের অংশগ্রহণমূলক ভোট। এটি সমর্থকদের আবেগ উদ্যাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর কোনো বাস্তব ট্রফি নেই এবং ব্যালন ডি’অরের মূল অনুষ্ঠানে দেওয়া আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই।
সংস্থাটির ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২৮ অক্টোবর বিশেষ এই ভোটের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।
একই সঙ্গে ঐতিহাসিক সুপার ব্যালন ডি’অর নিয়েও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে ফ্রান্স ফুটবল।
ফুটবল ইতিহাসে সুপার ব্যালন ডি’অর অত্যন্ত বিরল একটি সম্মাননা। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে মাত্র একবার এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। আগের তিন দশকে একাধিকবার ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলারদের মধ্য থেকে সেরাকে নির্বাচিত করাই ছিল সেই আয়োজনের লক্ষ্য।
সেবার বিশেষ এই সম্মাননা অর্জন করেন রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড আলফ্রেদো দি স্তেফানো। তিনি ইয়োহান ক্রুইফ ও মিশেল প্লাতিনির মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের পেছনে ফেলে পুরস্কারটি জেতেন।
দি স্তেফানো ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্যে স্প্যানিশ ক্লাবটি ইউরোপীয় ফুটবলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
এখন পর্যন্ত দি স্তেফানোই সুপার ব্যালন ডি’অর জয়ী একমাত্র ফুটবলার। ১৯৮৯ সালের পর আর কখনো এই সম্মাননা দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে আবার এটি চালুর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা নতুন আসরের তারিখও ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে চলমান বিশেষ ভোটে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। প্রকাশিত ভোটের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সেই মৌসুমের পক্ষে পড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট।
২০০৮ সালটি রোনালদোর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সময়। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছিলেন তিনি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ২০০৭-০৮ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
ওই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪২ গোল করেন রোনালদো। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতেন পর্তুগিজ তারকা।
অন্যদিকে আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির ২০১২ ও ২০১৩ সালের মৌসুম রয়েছে রোনালদোর পেছনে। প্রকাশিত হিসাবে দুটি মৌসুমই পেয়েছে ৯ শতাংশ করে ভোট।
বিশেষ করে ২০১২ সালটি মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় হিসেবে বিবেচিত। ওই বছর বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে সব মিলিয়ে ৯১ গোল করেছিলেন তিনি। এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড গড়ে ফুটবল ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
রোনালদোর ২০০৮ সালের সাফল্য এবং মেসির ২০১২ সালের অসাধারণ গোলের রেকর্ড ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এখনো আলোচনার বিষয়। বিশেষ এই ভোট সেই স্মরণীয় মৌসুমগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে আয়োজক সংস্থা পরিষ্কার করেছে, এই ভোটের ফলাফল দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত করা হচ্ছে না। এটি কেবল সমর্থকদের পছন্দের ব্যক্তিগত মৌসুম বেছে নেওয়ার একটি সুযোগ।
ফলে ভোটের শেষ পর্যন্ত রোনালদো শীর্ষে থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় নতুন কোনো ব্যালন ডি’অর কিংবা সুপার ব্যালন ডি’অর ট্রফি যুক্ত হবে না।
আগামী ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে শুধু জানা যাবে, ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ ভোটে ফুটবল ইতিহাসের কোন ব্যক্তিগত মৌসুমটি সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে।


