গত ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এই বাছাইপর্বে ১৩টি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। গ্রুপ ‘বি’-তে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করে সৌদি আরব। পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয় তাদের পরবর্তী ধাপে ওঠার পথ তৈরি করে দেয়। একই গ্রুপ থেকে হংকং ও মালয়েশিয়াও পরবর্তী পর্বে জায়গা করে নেয়। অন্যদিকে, গ্রুপ ‘এ’ থেকে উত্তীর্ণ হয় কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার।
এই ছয় দল ২০২৭ সালে এশীয় আঞ্চলিক ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সেখানে সেরা দুটি দল বৈশ্বিক বাছাইপর্বের প্লে-অফে খেলার সুযোগ পাবে। ১৬ দলের ওই প্রতিযোগিতা থেকে আটটি দল ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নেওয়ার টিকিট পাবে। ফলে সৌদি আরবের সামনে এখন লক্ষ্য শুধু আঞ্চলিক পর্যায়ে ভালো করা নয়, বরং পরবর্তী ধাপগুলোতেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।
অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা
সাম্প্রতিক সাফল্য সৌদি আরবকে আত্মবিশ্বাস জোগালেও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করা সহজ হবে না। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বিপক্ষে অতীতের ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা সেই চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরে।
২০১৯ সালের পর থেকে কাতারের বিপক্ষে ১১টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মাত্র তিনটিতে জয় পেয়েছে সৌদি আরব। কুয়েতের বিপক্ষে সাত ম্যাচে তাদের জয় তিনটি। আর বাহরাইনের বিপক্ষে ছয় ম্যাচে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে। এসব পরিসংখ্যান বলছে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয়ের ধারা বজায় রাখতে হলে সৌদি দলকে আরও উন্নতি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিজ্ঞতার দিক থেকেও প্রতিপক্ষদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে সৌদি আরব। দেশটি এখন পর্যন্ত ৬২টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। বিপরীতে বাহরাইনের ম্যাচসংখ্যা ১৩৪, কাতারের ৯০ এবং কুয়েতের ৮৮। নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা খেলোয়াড়দের চাপ সামলানো, কৌশল প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক মানের মাঠের অভাব বড় বাধা
সৌদি ক্রিকেটের উন্নয়নে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী মানের ক্রিকেট মাঠের অভাবে দেশটিকে বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক ম্যাচ কাতার ও ওমানে খেলতে হয়েছে।
নিজস্ব আন্তর্জাতিক মানের মাঠ গড়ে তোলা গেলে সৌদি আরবের পক্ষে দেশে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ বাড়বে। এতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পরিচিত পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি স্থানীয় দর্শকদের ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতিভা বিকাশ এবং দেশের অভ্যন্তরে ক্রিকেটের পরিসর বাড়াতেও উন্নত অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মাঠের উন্নয়ন একা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত প্রতিযোগিতা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা ও ম্যাচ বাড়ানোর পরিকল্পনা
সৌদি আরব ক্রিকেট ফেডারেশনের মহাব্যবস্থাপক ইকবাল সিকান্দার জানিয়েছেন, দেশটির ক্রিকেট আরও সুসংগঠিত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। খেলার মান উন্নয়ন, প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো এবং পেশাদার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়াতে দ্বিপক্ষীয়, ত্রিদেশীয় ও চার জাতির সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে পারলে খেলোয়াড়েরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য যাচাই করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দলের কৌশলগত প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা উন্নত করার পথও তৈরি হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সহযোগিতাও সৌদি আরবের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। প্রশিক্ষণ ও ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দেশটির খেলোয়াড় ও ক্রিকেট কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয়রা
দেশের ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড আইএলটি-টোয়েন্টি লিগের দলগুলোকে অন্তত একজন সৌদি ক্রিকেটার রাখতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের আসরের জন্য ছয় সৌদি ক্রিকেটারের মধ্যে চারজনকে দলে নেওয়া হয়েছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় খেলোয়াড়েরা অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পেশাদার ক্রিকেটের পরিবেশে এই অভিজ্ঞতা তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে।
সাম্প্রতিক বাছাইপর্বে ইশতিয়াক আহমেদের পারফরম্যান্স সৌদি ক্রিকেটের সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। ১১ অক্টোবর হংকংয়ের বিপক্ষে সৌদি আরবের ১০ রানের জয়ে চারটি উইকেট নেন তিনি। তাঁর শিকারগুলোর মধ্যে ছিল হ্যাটট্রিক। এমন পারফরম্যান্স দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি অন্য খেলোয়াড়দেরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
নারী ক্রিকেটেও গুরুত্ব
পুরুষদের ক্রিকেটের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটের বিকাশেও উদ্যোগ নিচ্ছে সৌদি আরব। দেশের ক্রিকেটকে বিস্তৃত করতে নারী খেলোয়াড়দের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি আন্তর্জাতিক নারী টুর্নামেন্ট এবং পুরুষদের ‘ডিউনস টোয়েন্টি’ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ কারিগরি কারণে পিছিয়ে গেছে।
এসব প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজন করা গেলে খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা বাড়বে এবং ক্রিকেটের প্রসারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিকল্পনার সুফল পেতে হলে আয়োজনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণে সৌদি আরবের সামনে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। উপ-আঞ্চলিক বাছাইপর্বে টানা পাঁচ জয় দলটিকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করা, স্থানীয় খেলোয়াড়দের পেশাদার ক্রিকেটে সুযোগ দেওয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সেই সাফল্য ধরে রাখাই হবে প্রধান কাজ। ২০২৭ সালের এশীয় আঞ্চলিক ফাইনাল তাই সৌদি ক্রিকেটের অগ্রগতি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে উঠবে।



