খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ২:২৩ পিএম
বাংলাদেশের বড় বড় মেগা অবকাঠামো রূপান্তরের নেপথ্যে একসময় অন্যতম প্রধান আর্থিক সহযোগী ও ঋণদাতা হিসেবে কাজ করেছে চীন। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা মেগা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন—একটির পর একটি মেগা প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল বেইজিং। তবে গত কয়েক বছরে সেই সুসম্পর্ক ও আর্থিক প্রবাহে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে। বর্তমানে নতুন কোনো বৃহৎ প্রকল্পে চীনের পক্ষ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলছে না বললেই চলে; পাশাপাশি হ্রাস পেয়েছে বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগও। এমনকি বহুল আলোচিত ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও মহাপরিকল্পনা’ প্রজেক্টেও বেইজিংয়ের অর্থায়ন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমীকরণ এবং কোভিড-পরবর্তী সময়ে চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ এখন এক নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সুনির্দিষ্ট উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ঢাকা-বেইজিং অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ঐতিহাসিক ঋণের পরিমাণ: ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে চীন মোট ১,১০৪ কোটি (১১.০৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ: প্রতিশ্রুত অর্থের বিপরীতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৭২২ কোটি ডলার ছাড় করতে পেরেছে।
সহযোগিতার স্বর্ণযুগ (২০১৬-২০২১): ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের পর থেকেই মূলত এই ঋণের সিংহভাগ অনুমোদিত হয়। ওই সফরে ২৭টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২,৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলার সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছিল চীন।
সাম্প্রতিক স্থবিরতা: ২০২১ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য ১১৩ কোটি ডলারের ঋণচুক্তির পর চীনা অর্থায়নে বড় কোনো নতুন ঘোষণা আসেনি। ২০২৩ সালে রাজশাহী ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য প্রদত্ত ২৮ কোটি ডলারের চুক্তিই এ যাবৎকালের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য আর্থিক বরাদ্দ।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একসময় চীন নিজেই আগ্রহ দেখিয়েছিল এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রস্তুত করেছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও বাংলাদেশ প্রথম ধাপের কাজ শুরুর জন্য চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার ঋণের আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠায়। তবে দফায় দফায় খসড়া আদান-প্রদান হলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনা থমকে যায়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটিতে অর্থায়নের নতুন সম্ভাবনা জেগে উঠলেও সফর শেষে কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চুক্তি বা অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এ প্রসঙ্গে জানান, “আগের ঋণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনা আপাতত স্থগিত রয়েছে। নতুন করে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) পরিচালনার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হচ্ছে।” ফলে বহুপ্রতীক্ষিত এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন অন্তত আরও কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্যসূত্রে বেইজিংয়ের আগ্রহ কমার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
১. প্রকল্পের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা: সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়া এবং অর্থছাড়ে জটিলতার কারণে নতুন ঋণ বরাদ্দের আগে চীনের মূল্যায়নকারী দল সার্বিক ঝুঁকি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ২. অবকাঠামোগত বাধা: বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে কুমিল্লা ইপিজেডে প্লট বরাদ্দ পেয়েও গ্যাস সংযোগের অভাবে বিনিয়োগ স্থগিত রাখার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। 3. মুক্তবাণিজ্য ও বাণিজ্যের বৈচিত্র্যয়ন (RCEP): বর্তমানে চীন তার বৈদেশিক বিনিয়োগের বড় অংশ সরিয়ে নিচ্ছে ‘রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকনোমিক পার্টনারশিপ’ (RCEP) ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে। বাংলাদেশের সাথে চীনের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) না থাকা এই প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ৪. চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা: বৈশ্বিক মন্দা এবং চীনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজারে সাময়িক মন্দাভাবের ফলে দেশটি বিশ্বব্যাপী নতুন ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করছে। ৫. ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন: কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা বিশ্ব ও এশীয় অঞ্চলে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সতর্কতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাবে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে।
চীন থেকে নেওয়া ঋণ নিয়ে দেশে-বিদেশে বিস্তর রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও বাস্তব তথ্যের সাথে প্রচলিত ধারণার বৈপরীত্য দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে মতামত প্রদান করতে গিয়ে বলেন:
“বাংলাদেশের সংগৃহীত মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশেরও কম এসেছে চীন থেকে, যা প্রায় জাপানের সমপরিমাণ। অথচ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করার ফলে চীনা ঋণ নিয়েই দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা সবচেয়ে বেশি হয়। অথচ বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের ওপর বাংলাদেশের ঋণভার অনেক বেশি হলেও তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে বেশ সীমিত।”
ঋণপ্রবাহে ভাটা পড়লেও বাংলাদেশের ঠিকাদারি খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর আধিপত্য এখনো প্রশ্নাতীত। ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ২৪০টি চীনা প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পদ্মা সেতুর মূল কাজ, নদীশাসন, পদ্মা রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো সুবিশাল প্রকৌশল বিস্ময়গুলো মূলত চীনা ঠিকাদারদের মাধ্যমেই সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। ফলে ঋণের সার্বিক অঙ্ক কমলেও দেশের নির্মাণ ও কারিগরি বাজারে চীনের বাণিজ্যিক অবস্থান শক্ত ভিত্তি ধরে রেখেছে।
মন্তব্য