খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই এপ্রিল ২০২৬, ২:১৯ পিএম
পহেলা বৈশাখ কেবল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রতিফলন—এমনটাই মনে করেন খ্যাতিমান নজরুলসংগীত শিল্পী ও ছায়ানটের সহ-সভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল। তাঁর মতে, এই দিনটি একটি ঘোষণার মতো—“আমি বাঙালি, আমার নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, এবং তা নিয়ে আমি গর্বিত।”
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় ও সাম্প্রতিক মহামারির বছরগুলো বাদ দিলে প্রায় প্রতি বছরই তিনি এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অনুষ্ঠান কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি লাখো মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবছর ভোরের কোমল আলো ফুটতেই রমনার বটমূলে ধ্বনিত হয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর। ভৈরব, ভৈরবী ও তোড়ি রাগের পরিবেশনার মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়, যেখানে কণ্ঠসংগীতের পাশাপাশি সেতার, সরোদ ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। এরপর পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য দেশীয় সুরকারদের গান, যা মানবতা, শান্তি ও দেশপ্রেমের বার্তা বহন করে।
শাকিল বলেন, “একসময় এই আয়োজন ছিল সীমিত পরিসরের; এখন এটি বৃহৎ সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ এখানে আসে, শিশুদের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির বীজ বপন করতে।” তাঁর নিজের সংগীতজীবনও এই মঞ্চকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে—প্রথমে দলীয় পরিবেশনা, পরে একক গানে অংশগ্রহণ।
রমনার বটমূলে বর্ষবরণ শুধু সংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আশপাশজুড়ে বসে বৈশাখী মেলা, যেখানে দেশীয় হস্তশিল্প, পিঠা-পুলি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নানা সাংস্কৃতিক উপকরণ স্থান পায়। এটি এক প্রকার জীবন্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একত্রিত হয়। শাকিলের মতে, এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাঙালির প্রকৃত শক্তি।
বর্তমানে এই উৎসব দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী বাঙালিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই উচ্ছ্বাসে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন, যা বাঙালি সংস্কৃতির বৈশ্বিক বিস্তারের প্রমাণ।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে শাকিল বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশুদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে পারলেই তারা বিশ্বায়নের এই যুগেও নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
নিচে পহেলা বৈশাখের প্রধান আয়োজনগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| আয়োজনের ধরণ | বর্ণনা |
|---|---|
| ভোরের সংগীতানুষ্ঠান | শাস্ত্রীয় রাগভিত্তিক পরিবেশনা দিয়ে সূচনা |
| দেশীয় গান | রবীন্দ্র, নজরুল ও লোকসংগীত |
| বৈশাখী মেলা | হস্তশিল্প, খাবার ও পোশাকের প্রদর্শনী |
| পারিবারিক অংশগ্রহণ | পরিবারসহ উৎসবে যোগদান |
| আন্তর্জাতিক উদযাপন | বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালন |
সবশেষে শাকিলের ভাষায়, “বিশ্ব সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে হলে আগে নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে হবে।” তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি স্মরণ করিয়ে দেয়—পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের এক অনন্য প্রকাশ।
মন্তব্য