খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই ডিসেম্বর ২০২৫, ৪:৫৬ এএম
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৌশক্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল নৌ-কমান্ডোদের পরিচালিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও ‘অপারেশন হটপ্যান্টস’। এই দুঃসাহসী অভিযানের কারিগর ছিলেন বাংলার সেই সব দামাল ছেলেরা, যাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল এক বিশেষ ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ হিসেবে। এই যোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী প্রশিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তর, যেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে একদা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটেছিল। ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমীকরণে, সেই পলাশীর পবিত্র মাটিতেই পাকিস্তানি শাসনের পতনঘণ্টা বাজানোর প্রস্তুতি শুরু হয়।
১৯৭১ সালের মে মাসে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর তিনজন অভিজ্ঞ অফিসারের সমন্বয়ে গঠিত একটি রিক্রুটিং টিম বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ঘুরে প্রাথমিকভাবে ৪৮০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে চূড়ান্ত প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করেন। ভাগীরথী নদীর খরস্রোতা জলরাশি আর নদীতীরবর্তী আম্রকাননে সারি সারি তাঁবু গেড়ে তৈরি করা হয় এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই ক্যাম্পটির সার্বিক নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারতীয় নৌবাহিনী, যার কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জি এম মার্টিস। প্রশিক্ষণ অফিসার হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন লেফটেন্যান্ট এ কে দাস ও লেফটেন্যান্ট কপিল।
নৌ-কমান্ডো বাহিনীর গঠন ও প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| ক্যাটাগরি | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|
| ক্যাম্পের অবস্থান | পলাশীর প্রান্তর, ভাগীরথী নদীর তীর, মুর্শিদাবাদ। |
| মূল নেতৃত্ব (ভারত) | লে. কমান্ডার জি এম মার্টিস, লে. এ কে দাস ও লে. কপিল। |
| বাঙালি সাবমেরিনার | ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন দুঃসাহসী নাবিক। |
| প্রশিক্ষণার্থী সংখ্যা | প্রাথমিক ৪৮০ জন (চূড়ান্ত ১৩৫ জন)। |
| প্রশিক্ষণের সময়কাল | মে ১৯৭১ থেকে অক্টোবর ১৯৭১ পর্যন্ত। |
| প্রধান লক্ষ্যবস্তু | চট্টগ্রাম, মোংলা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর বন্দর। |
| মূল রণকৌশল | নিঃশব্দে সাঁতার ও লিম্পেট মাইন ব্যবহার করে জাহাজ ধ্বংস। |
১৯৭১ সালের ১১ জুন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী এই ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর ভাষণ দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “নৌ-কমান্ডো মানে সুইসাইড স্কোয়াড। এর মানে একশ ভাগ মৃত্যু। এই কঠিন সত্য মাথায় রেখেই তোমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে।” তাঁর এই বজ্রকণ্ঠের আহবানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়; ৪৮০ জনের মধ্যে ৩৪৫ জনই সম্ভাব্য মৃত্যুর আশঙ্কায় নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন। অবশিষ্ট যে ১৩৫ জন অকুতোভয় তরুণ মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
এই ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস ছিলেন ফ্রান্স থেকে জীবন বাজি রেখে পালিয়ে আসা আটজন বাঙালি সাবমেরিনার। পাকিস্তান নৌবাহিনীর ‘পিএনএস ম্যানগ্রো’ সাবমেরিনে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তাঁরা বিদ্রোহ করেন। আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আবদুর রাকিব মিয়া, সৈয়দ মোশারফ হোসেনসহ আটজন মাদ্রিদ হয়ে ভারতে পৌঁছান। এই পেশাদার নৌ-সদস্যদের কারিগরি জ্ঞান ও নেতৃত্ব সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধার তেজ সঞ্চার করেছিল।
নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ ছিল অত্যন্ত কঠোর ও অমানবিক পরিশ্রমের। প্রতিদিন ভোরে হালকা ব্যায়াম ও দৌড়ানোর পর শুরু হতো ভাগীরথী নদীর উত্তাল স্রোতে সাঁতার। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটানা সাঁতার কাটতে হতো, যেখানে গলাপানিতে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫ মিনিটের বিশ্রামের সুযোগ ছিল। এরপর বিকেলে কমব্যাট জুডো এবং সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলত নিঃশব্দে সাঁতার কাটা ও পানির নিচে নিশ্বাস ধরে রাখার কৌশল। বিষাক্ত সাপ, তীব্র স্রোত আর বর্ষার করাল গ্রাসের মধ্যেই তাঁরা লিম্পেট মাইন বহন করার প্রশিক্ষণ নিতেন।
এই নৌ-যোদ্ধাদের অধিকাংশই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ তরুণ-যুবক। নদীমাতৃক বাংলার সন্তান হওয়ায় তাঁরা পানির সাথে মিতালি পাততে জানতেন। পাকিস্তানি বাহিনী যাতে কোনোভাবেই তাঁদের শনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য অনেক হিন্দু যোদ্ধা খতনা পর্যন্ত করেছিলেন। ভাগীরথী নদীর তীরে জন্ম নেওয়া এই ‘জলদানব’রাই পরবর্তীতে ১৫ আগস্টের সেই বিখ্যাত রাতে পাকিস্তানি নৌশক্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন।
মন্তব্য