ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া এক বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ আট দিন ধরে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী তানজিলা ইসলাম আশা দাবি করেছেন, চিকিৎসার অতিরিক্ত বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ভারতীয় প্রশাসন এবং কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের হস্তক্ষেপে কোনো অতিরিক্ত টাকা ছাড়াই মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উন্মোচিত হয়।
নিহত ব্যক্তির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল হাকিম সবুজ (৩২) পেশায় একজন চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনিজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার আশায় গত ৫ সেপ্টেম্বর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরুতে যান। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ওল্ড বিমানবন্দর সড়কে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মণিপাল হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।
তানজিলা ইসলাম আশা জানান, হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরপরই সবুজের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা শুরু হলে তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। তিনি জানান, চিকিৎসার শুরু থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার ভারতীয় রুপি পরিশোধ করেছিলেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, আগে পরিশোধ করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রসিদ দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কেও স্বজনদের আগে থেকে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর সবুজের ডান পায়ে গুরুতর সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পা কেটে ফেলেন। তা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি; শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সবুজ।
স্বামীর মৃত্যুর পর তানজিলা ইসলাম যখন মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তৈরি হয় নতুন সংকট। অভিযোগ ওঠে, মণিপাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তৎকালীন বকেয়া বিল হিসেবে ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার রুপি দাবি করে বসে। ওই বকেয়া অর্থ অবিলম্বে পরিশোধ না করলে মরদেহ ও তানজিলার ব্যক্তিগত পাসপোর্ট আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয়।
অসহায় অবস্থায় তানজিলা বেঙ্গালুরুতে নিযুক্ত বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ও স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে যোগাযোগ করে আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তার আবেদন জানান। টানা আট দিন ধরে চলে টানাপোড়েন। অবশেষে ২৬ সেপ্টেম্বর কোনো অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ছাড়াই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহ স্বজনদের কাছে তুলে দিতে বাধ্য হয়। সবুজের বন্ধু মোহাম্মদ মোক্তাদির হোসেন নিশ্চিত করেন যে, প্রারম্ভিক ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপির বাইরে আর কোনো টাকা দিতে হয়নি এবং স্থানীয়দের সহায়তায় আটকে রাখা পাসপোর্টও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মণিপাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা মরদেহ হস্তান্তরের কথা স্বীকার করলেও প্রাথমিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও মরদেহ আটকে রাখার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেননি। তবে পরবর্তীতে হাসপাতালটি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করে। বিবৃতিতে তারা জানায়, রোগী অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসাকালীন একাধিকবার তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় তা পুনরুদ্ধার করা হয় এবং উন্নত লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।


