মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়া এবং জি-৭ দেশগুলোর কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তের প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় নতুন হামলার আশঙ্কা এখনো বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে রেখেছে। বাড়তি সরবরাহের ফলে আপাতত সেই উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুরের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ সেন্ট বা দশমিক ৭১ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৫৯ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে ১ দশমিক ০৫ ডলার বা ১ দশমিক ২ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৫০ ডলারে।
তেলের বাজারে দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে জি-৭-এর সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে। গত শুক্রবার জি-৭ দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জোটটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাজারের জন্য এই পদক্ষেপের তাৎপর্য হলো, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাৎক্ষণিক ঘাটতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত জ্বালানি হাতে থাকবে। ফলে সরবরাহ সংকট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাস্তব তেল সরবরাহ বাড়ার তথ্য। জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে চার দিন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলার ঘটনা সত্ত্বেও এই সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, জি-৭-এর কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমিয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিও যুদ্ধপূর্ব মাত্রার কাছাকাছি ফিরছে—এমন ধারণা বাজারে তৈরি হয়েছে।
তবে সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনে এখনো বেশি ব্যয় এবং তুলনামূলক কম কার্যকর রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে সরবরাহ বাড়লেও পরিবহন ব্যয় ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, ইউরোপের জ্বালানি বাজারে চিত্র ছিল ভিন্ন। সোমবার ইউরোপে গ্যাসঅয়েল ফিউচারের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১ হাজার ৩৯০ দশমিক ২৫ ডলারে পৌঁছায়। এতে বোঝা যায়, অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমলেও পরিশোধিত জ্বালানি বাজারে যুদ্ধজনিত ঝুঁকির প্রভাব এখনো প্রবল।
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিও বাজারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। ইয়েমেনের হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি আরবের রিয়াদ ও খুরাইস এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ দাবির বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর এক দিন আগে, রোববার সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাই বাজারের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এই পথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে বর্তমানে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতির যেকোনো বড় পরিবর্তন আবারও বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।
সোমবারের দরপতন তাই তেলের বাজারে স্থায়ী স্বস্তির ইঙ্গিত নয়; বরং বাড়তি সরবরাহ এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহারের কারণে তৈরি হওয়া সাময়িক ভারসাম্যের প্রতিফলন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় ও নিরাপত্তাঝুঁকির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।


