রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে ভোগা ৬৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উত্তরার একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রের (রিহ্যাব) দুই কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। পরে তদন্তে নেমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
বুধবার রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের লাইটহাউস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুই কর্মীকে আটক করা হয়। তাঁরা হলেন মো. জসিম উদ্দিন ওরফে পলাশ (৪৭) এবং মো. আমিনুর ইসলাম (৪২)। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় ব্যবহৃত হাতকড়াটিও জব্দ করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জুয়েল রানা বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানান।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে মোহাম্মদপুর থানার স্যার সৈয়দ রোডের একটি বাসায় চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি প্রবেশ করেন। তাঁরা ৬৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে জোর করে বাসা থেকে নিচে নামিয়ে আনেন। পরে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আকস্মিক এ ঘটনায় ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এরপর মোহাম্মদপুর থানা থেকে ওই ব্যক্তির পরিচয় ও তাঁকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
পুলিশ পরে জানতে পারে, ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে ভুগছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা পৃথক স্থানে বসবাস করেন। চিকিৎসার জন্য তাঁর ছোট ভাই তাঁকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের লাইটহাউস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এর আগেও তাঁকে একই কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার পর উত্তরা পশ্চিম থানার মাধ্যমে ওই পুনর্বাসন কেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একপর্যায়ে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে লাইটহাউস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে নেওয়া হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
এরপর কেন্দ্রটির মালিকের কাছে জানতে চাওয়া হয়, চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের জন্য কোনো ব্যক্তিকে নেওয়ার সময় হাতকড়া ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি কী। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে মালিক কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছু ব্যক্তিকে রিহ্যাব সেন্টারে নেওয়ার সময় হাতকড়া ব্যবহার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা বলেন, ওই অসুস্থ ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানোর অনুমোদন রিহ্যাব সেন্টারটির নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে এবং এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার পাশাপাশি তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং শারীরিক restraint বা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কেন দেখা দিয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এ বিষয়ে লাইটহাউস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আটক জসিম উদ্দিন ও আমিনুর ইসলামকে ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।


