রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে এক পুলিশ সদস্যকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করেছেন কয়েকজন ব্যক্তি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে কালশী সড়কে এ ঘটনা ঘটে। আহত পুলিশ সদস্য মো. সাইমনকে চিকিৎসার জন্য রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর-১১ এলাকা থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁরা কালশীর দিকে চলে যান। এ সময় পল্লবী থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিরপুর-১১ এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। পথে অন্য সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কনস্টেবল সাইমনকে পেয়ে কয়েকজন তাঁর ওপর হামলা চালান।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি লাঠি দিয়ে ওই পুলিশ সদস্যকে আঘাত করছেন। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। তবে হামলার পেছনে কারা ছিলেন, তাঁদের পরিচয় কী কিংবা এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
মিরপুর-১১ এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ
পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জবাবে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
সংঘর্ষের সময় মেট্রো স্টেশনের ভেতরে বেশ কয়েকজন যাত্রী আটকা পড়েন। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের পদক্ষেপের কারণে ওই এলাকায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন।
সকাল থেকেই পল্লবীর শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে কয়েক হাজার শ্রমিক অবস্থান নেন। তাঁদের কারও কারও হাতে লাঠিসোঁটাও দেখা যায়। পরে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে এলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সড়কে শ্রমিকদের অবস্থান, পুলিশের বাধা এবং সংঘর্ষের কারণে জননিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পাঁচজন গ্রেপ্তার, দাবি পুলিশের
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, পূরবী শিল্প এলাকার বিভিন্ন গলি থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাঁরা পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
ওসি আরও জানান, আন্দোলনকারীদের প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে আহত পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শ্রমিকদের দাবিদাওয়া মোকাবিলা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মজুরি দাবির আন্দোলনে নিরাপত্তা ও জনভোগান্তির প্রশ্ন
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ধরনের কর্মসূচিতে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনা এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সংঘর্ষ এড়ানোও জরুরি।
পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কারা সহিংসতায় জড়িত, তা নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা প্রয়োজন, যাতে কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় পুরো শ্রমিকসমাজের ওপর চাপানো না হয়।
মিরপুরের ঘটনায় আহত পুলিশ সদস্যের চিকিৎসা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি এবং সংঘর্ষের পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে। আপাতত পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।


