মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রক্ষায় জাসদ রাজনীতির গৌরবজনক ধারাবাহিকতা

জিয়াউল হক মুক্তা

এক.

কোন কোন গণমাধ্যম ও ব্যক্তি তাদের প্রতিবেদন ও রচনায় জাসদ শব্দের পাশে বন্ধনীতে নেতৃত্বের নাম উল্লেখ করে দলের পরিচয় প্রদান করলেও আইনগতভাবে বাংলাদেশে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ নামে মাত্র একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে। তাদের এমন আচরণ লেখালেখির ও সাংবাদিকতার স্বাভাবিক নৈতিকতার পরিপন্থি। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে জাসদের নিবন্ধন নম্বর ১৩, ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ৩৫-৩৬ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এবং এই দলের সভাপতি, কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন যথাক্রমে হাসানুল হক ইনু, অ্যাডভোকেট রবিউল আলম ও শিরীন আখতার। জাসদ কোনো কমিউনিস্ট দল নয়, একটি ‘সমাজতান্ত্রিক গণসংগঠন’।

দুই.

১৯৬২ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গোপন ও প্রকাশ্য আন্দোলনের নেতা-কর্মীগণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠন করেন। জাসদ শতভাগ মুক্তিযোদ্ধার দল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দেশ পুনর্গঠন ও দেশ পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব শক্তির অংশগ্রহণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন দাবি করে জাসদ। ফলে জাসদের ওপর নেমে আসে শাসক দল আওয়ামী লীগ ও সরকারের ভয়াবহ নিপীড়ন। প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৬ মাস পর ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ থেকে জাসদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে থাকে এবং মাত্র তিন বছর দুই মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে জাসদ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হয়।

তিন.

জাসদ নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যকার বিভক্তির সুযোগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় সেনা কর্মকর্তা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধুর তখনকার দল বাকশাল পলিটব্যুরোর সদস্য ও সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য পাকিস্তানপন্থি খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট জাসদ ও আরও দুটি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান বিষয়ে দেশবাসীকে প্রকাশ্যে সতর্ক করা হয়।

চার.

পাকিস্তানপন্থা ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে কয়েকজন ক্ষমতালোভী সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর আবারও ক্ষমতা দখল করেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে রাজনৈতিক আঁতাত করে নিরাপত্তা দিয়ে তাদের দেশ থেকে চলে যেতে দেন। এভাবে সেনাবাহিনীর অফিসারগণ বারবার সেনাশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ক্ষমতা দখলের খেলায় মেতে উঠলে জাসদ নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের মুক্তিযোদ্ধা-সিপাহিদের নেতৃত্ব দিয়ে মহান সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন।

পাঁচ.

কিন্তু সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ফেরত সেনা-অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবিপ্লব সংঘটিত করেন, কর্নেল তাহের বীরউত্তমকে গোপন সামরিক আদালতের বিচারের রায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন ও জাসদ নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন, সেনাবাহিনীর আড়াই হাজারের বেশি মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সিপাহিকে হত্যা করেন, জোর করে ক্ষমতা দখল করেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে সাম্প্রদায়িক ও পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতি, প্রশাসন ও সরকারে পুনর্বাসিত করেন। সংবিধান সংশোধন করে ১৫ আগস্ট হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেন ও সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ করেন; অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত করেন।

ছয়.

জিয়াউর রহমানের অপশাসনের বিরুদ্ধে জাসদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দশদলীয় ঐক্যজোট গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দলের ভেতরে থাকা চরম বামপন্থিরা এই ঐক্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিপ্লবী দল গঠন প্রক্রিয়া বিষয়ে হাজার হাজার তরুণ নেতাকর্মীকে বিভ্রান্ত করে দল ভেঙে দেন। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর এমন আকস্মিক দলত্যাগ জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট করে।

সাত.

প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার রাজনীতির প্রবর্তক জিয়াউর রহমান অবশেষে ১৯৮১ সালে কতিপয় সেনাকর্মকর্তার ব্রাশফায়ারে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে অপসারণ করে দেশে আবারও সেনাশাসনের সম্ভাবনা দেখা দিলে তখনকার জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব সেনাপ্রধান এরশাদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য জনসভায় বলেছিলেন, “গর্ত থেকে মাথা বের করবেন না, মাথা ভেঙে দেব।” কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান রাতের আঁধারে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার অল্প দিন পরে ছাত্রদের নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে আ স ম আবদুর রব ও আরও কিছু জাসদ নেতা তাঁকে অনুসরণ করে ১৯৮৩ সালে দলত্যাগ করেন ও সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু অল্প দিন পরেই তিনি আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন ও সামরিক শাসকের দোসর হিসেবে রাজনীতি করতে থাকেন।

আট.

জাসদ বাংলাদেশের বাম, প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ১৫ দল গঠন করে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। কিন্তু সামরিক শাসনের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে গিয়ে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জাসদের নেতৃত্বে ৫ দল ও বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের গঠিত দল বিএনপি এ সময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনগণের কাতারে শামিল হয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৮৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল সংসদ ছেড়ে আন্দোলনে ফিরে আসে। এ সময় সামরিক শাসকের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে জাসদ নেতা শাজাহান সিরাজ দলত্যাগ করেন ও পরে ভিন্ন দল গঠন করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পুনর্বাসিত ও পুনর্গঠিত যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত ৫ দল, ৭ দল ও ৮ দলের বাইরে থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের নামে সামরিক শাসকের ছত্রছায়ায় সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে। এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১০ দলীয় ঐক্যজোট গঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যারা জাসদ ত্যাগ করেছিলেন, তাঁরাও প্রথমে ১৫ দলের অংশ হিসেবে ও পরে ৫ দলের অংশ হিসেবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

নয়.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণ বিষয়ে মতবিরোধের ফলে ১৯৮০, ১৯৮৩ ও ১৯৮৮ সালে পরপর তিনবার জাসদের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব দলত্যাগ করলেও দল হিসেবে জাসদ সব সময় জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের কাতারে থেকেছে। দলের ঐক্য রক্ষার নাম করে জাসদ জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের পথ থেকে কখনো সরে যায়নি—জাসদ সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলেছে। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন প্রমাণ করে যে জনগণের ন্যায্য অধিকারের রাজনীতি বাদ দিয়ে কেবল দলের নামে রাজনীতি করলে বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন হতো না; বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন বড় বড় নেতাগণ ৮ দফাপন্থি আওয়ামী লীগ গঠন করে প্রথম দল বিভক্ত করেন ও পরে ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে যান। অনুরূপ, স্বাধীন বাংলাদেশেও জরুরি জাতীয় সংগ্রাম এড়িয়ে বিশুদ্ধ কমিউনিস্ট দল গঠনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বা সামরিক শাসনের কাছে গণতন্ত্র বিকিয়ে দিয়ে জাসদ জনগণের সংগ্রামের সঙ্গে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। বিরতিহীনভাবে জাসদের আপসহীন ভূমিকার ফলে সামরিক শাসনের ও সামরিক শাসকদের কবল থেকে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ করতে পেরেছিল।

পাঁচ দল, সাত দল ও আট দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে সামরিক শাসককে বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়। জাসদ তখন সব দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল গণআন্দোলনের ধারায় জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে; কিন্তু দেশের তখনকার কোনো রাজনৈতিক দল এতে সাড়া দেয়নি।

দশ.

অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিপরীতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ বা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারার সূচনার পর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে অতীত জাতির ওপর পরিচালিত অন্যায়ের বিচারের দাবি জোরালো হয়; বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল জাসদ ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী থেকে একজন করে মোট দুজন সদস্য ও অন্যরা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের স্টিয়ারিং কমিটির নেতৃত্ব দেন। এখানে উল্লেখ করে রাখা জরুরি যে, জাসদ ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী আরেফ আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ১৯৬২ সালে গঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গোপন রাজনৈতিক-সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা নিউক্লিয়াসের সদস্য। সরকারে অবস্থানরত বিএনপি এই আন্দোলনকে সর্বাত্মকভাবে দমনের চেষ্টা করে; শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সরকারের দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

এগারো.

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে জেএসডির আ স ম আবদুর রবের সমর্থনে সরকার গঠন করে। ১৯৮১, ১৯৮৩ ও ১৯৮৮ সালে জাসদ পরিত্যাগকারী নেতৃত্বের অনেকে মূল দলে ফেরত আসেন ১৯৯৭ সালের ৩১ অক্টোবর। পরে আওয়ামী লীগকে কেবলমাত্র ক্ষমতায় আসীন করার জন্য সমর্থন দানের ঐক্যকে জাসদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বৃহত্তর ঐক্যের রাজনীতিতে রূপান্তরের আহ্বান জানায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও দলের নেতা জনাব রব তাতে সম্মত হন না। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বিএনপি ও জামায়াত চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এবং পরের নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করা আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসীন হয়।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন—জাসদের এমন রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ২০০১ সালে জনাব রব আবারও দলত্যাগ করেন এবং পরে আলাদা দল গঠন করেন।

বারো.

চারদলীয় জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দ্রব্যমূল্য, জ্বালানিমূল্য, সার-বীজ-কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকটের পাশাপাশি সারা দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক জঙ্গিদের সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে থাকে। প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোকে সমরাস্ত্র সরবরাহের রুটে পরিণত হয় বাংলাদেশ। এমনকি সারা দেশে সন্ত্রাসবাদী হামলার ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ বিরোধী দলের নেতাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সমাবেশেও গ্রেনেড হামলা করা হয়। চারদলীয় জোটের দেশ পরিচালনার দ্বিতীয় বছর ২০০২ সাল থেকে জাসদ প্রথমত এককভাবে ও পরে যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের ধারায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের জন্য ব্যাপক সংলাপ-আলাপ-আলোচনা ও দূতিয়ালি পরিচালনা করতে থাকে। এরকম প্রেক্ষাপটে অবশেষে ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোর অংশগ্রহণে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠিত হয়। জাসদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়াবলি নিয়ে প্রণীত ১৪ দলের ২৩ দফা ঘোষণা করা হয় ২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর পল্টন ময়দানে আয়োজিত জোটের জনসভা থেকে।

কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংস্কার না করে চারদলের সরকার ১৪ দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং একতরফা নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করে। তীব্র সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদের সময়সীমা বিষয়ক সাংবিধানিক অস্পষ্টতার কারণে এই সরকার দীর্ঘমেয়াদি হয়। ২০০৭ সালে ১৪ দলের আদর্শিক জোট সম্প্রসারণ করে নির্বাচনী মহাজোট গ্রহণ করা হয়। একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন ও একসঙ্গে দেশ পরিচালনা বিষয়ে জোটভুক্ত দলগুলো ঐকমত্যে উপনীত হয়।

তেরো.

২০০৯ সালের নির্বাচনে ১৪ দলের নির্বাচনী মহাজোট বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। অচিরেই নতুন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিডিআর বিদ্রোহকে উপলক্ষ্য করে দেশকে অস্থিতিশীল করার বহুমাত্রিক চেষ্টা হয়। এ বছর ১৯৯৬ সালে সূচিত ও চারদলের শাসনামলে স্থগিত করে রাখা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শেষ হয় এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে শুরু হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিএনপি-জামায়াত যৌথভাবে যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলনের বিরোধিতা করতে থাকে। সারা দেশে তারা ৯৩ দিনের এক ভয়াবহ আগুন সন্ত্রাস পরিচালনা করে। বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এক বিবৃতিতে সরাসরি অভিযোগ করেন যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে; যদিও ভারত-পাকিস্তানের সিমলা চুক্তি ও বাংলাদেশ-ভারত দিল্লি চুক্তির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার কোনো অঙ্গীকার করা হয়নি। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত সমাবেশ উপলক্ষ্যে বিরোধী দলের নেতা সরকার ফেলে দেওয়ার ঘোষণাও দেন। সরকার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড এফেক্ট ব্যবহার করে ঢাকায় হেফাজতি তাণ্ডব মোকাবিলা করে।

চৌদ্দ.

২০১১ সালে বিচার বিভাগ নিজেদেরকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের নির্দেশ দেয়। সংবিধান থেকে অনির্বাচিত সরকারের বিধান প্রত্যাহার করা হয়। ২০১৩ সালের ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে সরকারি ও বিরোধীদলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনকালীন দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি-জামায়াত ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল আবারও বিজয়ী হয়।

কিন্তু পরে ২০২৮ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই বিএনপি-জামায়াত ২০ দল গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে; কিন্তু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে বিএনপি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা থেকে বিরত থাকে।

পনেরো.

এ সময়কালে ২০১৬ সালে জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে ভোটে পরাজিত কতিপয় জাসদ নেতা দলের কাউন্সিল অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন এবং ভোর রাতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বক্তৃতা দিয়ে আলাদা কমিটি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন তাদের এমন অসাংগঠনিক কার্যক্রমকে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের এহেন কার্যক্রম জাসদকে ১৪ দলের বড় দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষির শক্তিকে ভীষণভাবে কমিয়ে দেয় এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের ঐক্য ও সংগ্রামের নীতিকে দুর্বল করে। তাদের পরবর্তী কয়েক বছরের কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্রমাগতভাবে দুর্বল করে।

ষোলো.

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। বহু আন্তর্জাতিক, আন্তঃসরকারি ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের মতে, (ক) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, (খ) মানব উন্নয়ন ও (গ) প্রতিবেশগত উন্নয়নে একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওই দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করে।

দেশে বিপুল উন্নয়ন-অগ্রগতি সংঘটনকালে জাসদ সংসদের ভেতরে ও বাইরে উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে (ক) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে বেড়ে যাওয়া ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্য নিরসনে, (খ) সাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ দমনে, (গ) দুর্নীতি-লুটপাটের সিন্ডিকেট মোকাবিলায় এবং (ঘ) সন্ত্রাস-দলবাজি-দলীয়করণ বন্ধে সরকারকে কার্যকর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়। সরকার ও সরকারের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সেসব আহ্বান উপেক্ষা করে, এমনকি সংসদ সদস্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় সংসদে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ওপর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যগণ ঝাঁপিয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল ক্ষমতায় থাকাকালে টেকসই উন্নয়নের স্বীকৃত তিন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতির সম্পূরক কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংঘটিত হয়নি মূলত আওয়ামী লীগের অনীহার কারণে।

উপরন্তু ১৪ দলকে আদর্শিক জোট হিসেবে পরিচিত করার পরও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বাইরে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে ১৪ দলের কখনো কোনো সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি; নির্বাচনে ১৪ দলের অংশগ্রহণ কেবল সীমিত পরিসরে মনোনয়ন দান পর্যন্ত সীমিত থাকে; জোটের প্রার্থীদের বিজয়ের জন্য সব দল সমানভাবে ভূমিকা রাখেনি; ক্ষেত্রবিশেষে জোটের ছোট দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বড় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়া হয়; স্থানীয় নির্বাচনে জোটের রাজনীতির কোনো প্রতিফলন ঘটেনি; কেন্দ্রীয় সরকারের দেশ পরিচালনায় ১৪ দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি এবং এক দলের একক কর্তৃত্ব বজায় রাখা হয়; সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ না করে কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্যে তা সীমিত রাখা হয়। ধারাবাহিক বৈষম্য-সাম্প্রদায়িকতা-দুর্নীতি-লুটপাট-সিন্ডিকেট-দলবাজি-দলীয়করণ-সন্ত্রাস সরকারের প্রতি জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

এরকম প্রেক্ষাপটে জাসদ সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ দমনের পাশাপাশি দুর্নীতি-লুটপাট-সিন্ডিকেট-দলবাজি-দলীয়করণ-সন্ত্রাস দমন এবং বৈষম্যের অবসানের দাবিতে সংসদে ও সংসদের বাইরে নীতিগত অবস্থান নেয়। জাসদ দাবি জানায় যে সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যদি দুর্নীতি-লুটপাট-সিন্ডিকেট-দলবাজি-দলীয়করণ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান না নেয়। কিন্তু সরকার জাসদের কথায় কর্ণপাত করেনি। উপরন্তু বড় দলের অবমাননাকর রাজনৈতিক আচরণ জোটের ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

জাসদ তারপরও রাজনৈতিক জোট ১৪ দল পরিত্যাগ করেনি। জাসদ বারবার দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সব রাজনৈতিক দলকে প্রকাশ্যে সতর্ক করতে থাকে যে দেশে অনির্বাচিত বা অসাংবিধানিক বা ছদ্মবেশি বা প্রক্সি সরকার প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে। তবুও কোনো রাজনৈতিক দল জাসদের কথায় কর্ণপাত করেনি।

এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আয়োজিত নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এবং সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীগণ প্রকাশ্যে পেশিশক্তি ও কালো টাকা ব্যবহার করেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরের একটি শক্তিশালী চক্র আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোটের অভিন্ন প্রার্থীদের পরাজিত করতে এবং তাদের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রার্থীকে সংসদে নিয়ে আসার জন্য প্রকাশ্যে ন্যক্কারজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এভাবে আওয়ামী লীগ এককভাবে ও অপরাপর প্রায় সব আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীগণ নির্বাচনে বিজয়ী হন—নামে-বেনামে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল জাতীয় সংসদে জায়গা পায় না। ২০২৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৪ দল এগিয়ে যাওয়ার বদলে একটি অকার্যকর জোটে পরিণত হয়।

সতেরো.

অসাংবিধানিক বা অস্বাভাবিক বা ছদ্মবেশি বা প্রক্সি সরকার কায়েমের অপপ্রয়াসের বিপরীতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ১৬-১৭ ফেব্রুয়ারি জাসদ জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়, “রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র ও জ্ঞাতি সম্পর্ক ক্রমাগত প্রভাবশালী নিয়ামকে পরিণত হচ্ছে। পরিবারতন্ত্র ও জ্ঞাতি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রবাহিত হচ্ছে। পরিবারতন্ত্র ও জ্ঞাতিসম্পর্কের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত-পালিত হচ্ছে উল্লিখিত লুটপাট-দুর্নীতির দানবীয় সিন্ডিকেট, …রাজনীতিতে লুটপাট-দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং পরিবারতন্ত্র ও জ্ঞাতি সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিকতা ধ্বংস হয়ে রাজনীতিতে বিকৃতি ও বিরাজনীতিকরণ জোরদার করছে। … রাজনীতি ও সমাজে লুটপাট-দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং পরিবারতন্ত্র-জ্ঞাতিসম্পর্কের সীমাহীন প্রভাব আইনের শাসন ও সুশাসনকে সুদূরপরাহত করছে। সমাজে সম্ভোগ-নৃশংসতার সংস্কৃতি বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। সাধারণ মানুষ ক্রমাগতভাবে অসহায়ত্ব, অক্ষমতা, ভীতি ও হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। মনুষ্যত্ব, স্বপ্ন, মূল্যবোধ, নীতি, আদর্শ ও মনোবল হারিয়ে ফেলছেন মানুষ।”

জাসদ জাতীয় কমিটির ওই সভার রাজনৈতিক প্রস্তাবে আরও বলা হয়, “… সকল সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদি গোষ্ঠীর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র-মানবতা-উন্নয়ন-অগ্রগতি-প্রগতির বিরুদ্ধে একটি অলিখিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অলিখিত অকাঠামোগত ঐকমত্য সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতার জমিনে যে কোনো সময় কাঠামোগত রূপ পরিগ্রহ করে বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য ভয়ানক হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে।”

পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জাসদের ওই আশঙ্কা দুঃখজনকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়। দেশে জঙ্গি ক্যু সংঘটিত হয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অনির্বাচিত-অসাংবিধানিক-ছদ্মবেশি-প্রক্সি সরকার কায়েম হয়। ২০২৬ সালের রাজনীতি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে পরের অনুচ্ছেদগুলোতে এসব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হচ্ছে।

আঠারো.

সরকারি চাকরির নবম গ্রেডের নিয়োগে কোটাপ্রথা বিলোপের সরকারি প্রজ্ঞাপন আদালত কর্তৃক বাতিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে সূচিত ছাত্র আন্দোলনের প্রথম দিকে আন্দোলনকারী ও সরকারের অবস্থানের মধ্যে কোনো ফারাক না থাকার পরেও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণে পরিস্থিতি ক্রমে সরকারের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। সামাজিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনিক উদ্যোগে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

জাসদ নেতৃত্ব সেই সময় দলীয় বিবৃতি, ভিডিও বার্তা ও গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে (ক) কোটা বহাল বা বাতিল নয়, কোটা সংস্কারের পক্ষে দাবি জানায়, (খ) শিক্ষাঙ্গণে পুলিশি অবস্থান ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করে, (গ) আন্দোলনে শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে, (ঘ) সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপ ও আলোচনার জন্য বারবার বিশেষভাবে আহ্বান জানায় এবং (ঙ) ছাত্রদের আন্দোলনে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশি সন্ত্রাসী, অন্তর্ঘাতকারী ও খুনিরা সুযোগ নিতে পারে বলে সকলকে সতর্ক করে।

এমন পরিস্থিতিতে একদিকে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর বিলম্বিত ও বিতর্কিত উদ্যোগ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে; এবং অন্যদিকে আন্দোলনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আধুনিক ও উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সন্ত্রাসী অন্তর্ঘাতকদের স্নাইপার রাইফেলের ৭.৬২ বোরের গুলিতে ছাত্র হত্যা, পুলিশ হত্যা ও জেল ভাঙাসহ সন্ত্রাস ও প্রাণহানির তাণ্ডব বয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট আইডির ভয়াবহ মিথ্যাচারের ফলে “ক্রমাগতভাবে অসহায়ত্ব, অক্ষমতা, ভীতি ও হতাশায় নিমজ্জিত” মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করলে ছদ্মবেশি সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে; ফলশ্রুতিতে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জীবন বাঁচাতে তখনকার প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।

উনিশ.

এরপর জামায়াত-হিজবুত-হেফাজতসহ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি রাজনীতির গতিপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সংবিধানের ১০৬ ধারার আওতায় সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে প্রক্রিয়াগত সব ধরনের দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতিতে ৮ আগস্ট ২০২৪ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সংবিধানে বিধান না থাকা একটি “অন্তর্বর্তী সরকার” শপথ গ্রহণ করে। কেবলমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সুপ্রিম কোর্টের একটি ‘ব্যাখ্যা’ থেকে জানানো হয় যে, “রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরি প্রয়োজনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন।”

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ে সূচিত আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত পরিচালিত সন্ত্রাসী অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ এবং ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ওই গোষ্ঠী পরিচালিত প্রকাশ্য মব সন্ত্রাস, এবং ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়-আশ্রয়-মদদ-সহযোগিতায় পরিচালিত সকল মব ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশে মিথ্যাচার ও গণপ্রতারণার মাধ্যমে একটি সাম্প্রদায়িক জঙ্গি ক্যু সংঘটিত হয়েছিল।

কুড়ি.

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে চরম এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সূচনা হয়। সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়। শত শত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর ঘরবাড়ি-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয় ও ঘরছাড়া-এলাকাছাড়া-দেশছাড়া করা হয়। ৫ আগস্ট জঙ্গি ক্যুর ফলে কেবল আওয়ামী লীগ সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরই পতন হয়নি, জাসদসহ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও বাহক বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা তথা সমগ্র বাংলাদেশ এবং জনগণ এক চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়।

ইউনূস শাসনামলের বাংলাদেশে নদী ও জলাশয় থেকে লাশ উদ্ধার হয় নিয়মিত, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরে পর্যন্ত খুন হয় প্রতিনিয়ত, কখনো কখনো এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, অফিস-আদালত-শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে রাজপথে গণপিটুনি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা, বাউল-ফকিরদের আখড়া-মাজারসহ ধ্বংস করা হয় ভিন্নমতাবলম্বীদের পবিত্র স্থান, কলকারখানা থেকে শুরু করে বস্তি ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় যখন-তখন, এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে ডাকাতি হয় অনবরত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পদ দখল চলে অব্যাহত গতিতে, অফিস থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঁদাবাজি হয়ে ওঠে রুটিন ওয়ার্কের মতো স্বাভাবিক ঘটনা, ধর্ষণ এবং এমনকি স্বামী-পুত্রের সামনে নারীকে ধর্ষণ ও তাঁদের বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলিং চলে অহরহ, পথে পথে চলে ছিনতাই-রাহাজানি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি হত্যা করা প্রশ্নাতীত সন্ত্রাস হিসেবে চর্চা করা হয়। এভাবে বাংলাদেশের সকল মানুষের জনজীবন সর্বব্যাপক গুন্ডাতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়, জনগণের জান-মাল-ইজ্জতের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিহ্ন হয়। ভয়ানক এক নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় মানুষের শরীর ও মন। সারা দেশে চলে “জোর যার মুল্লুক তার” নীতির বাস্তবায়ন আর পেশিশক্তির উন্মত্ত আস্ফালন।

ইউনূস সরকার শুরু থেকে আদালত-শিক্ষাঙ্গন-গণমাধ্যম-প্রশাসনে মব পরিচালনা করে ইচ্ছেমতো চাকরিচ্যুতির মহোৎসবে মেতে ওঠে; পরে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে দেশ উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বীকৃত ক্ষমতা খর্ব করে এসব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের অবশিষ্ট ক্ষমতাকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। ইউনূস সরকার ২০২৪ সালের ৫-৮ আগস্ট গণভবন থেকে লুণ্ঠিত এএসএফের অত্যাধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন, পুলিশের থানা-ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনাল থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ইউনূস সরকার এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ইচ্ছেমতো আইন-কানুন বদলে সমস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়। প্রবৃদ্ধির মন্দা, আর্থিক খাতে মন্দা ও স্থবিরতা, কারখানা বন্ধ হওয়ায় চাকরি হারানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান না হওয়া, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও ফসলের দাম না পাওয়া, বাজারের অস্থিতিশীলতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দারিদ্র্য পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায় এবং কোটি মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা ধ্বংস করে।

ইউনূস সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্ট্র্যাটেজিক খাতগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়। লালদিয়ার কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য এবং নারায়ণগঞ্জের পানগাঁওয়ের ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি ইজারা চুক্তি করে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে জনগণকে অন্ধকারে রেখে আলোচনা চালায়, যা পরে গণবিরোধিতা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়।

ইউনূস সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, জুলাই সনদ, নতুন বন্দোবস্ত, সেকেন্ড রিপাবলিক, রাষ্ট্র সংস্কার ইত্যাদি শব্দের আড়ালে ১৯৭২ সালের সংবিধান, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে ছুড়ে ফেলার ও ধুয়েমুছে ফেলার অভিযান শুরু করে।

ইউনূস সরকার “রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনা”র সীমা লঙ্ঘন করে সংবিধানের ওপর হাত দেয়, ইচ্ছামতো অধ্যাদেশ জারি করে, সংবিধান লঙ্ঘন করে আইনের শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খুন ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনার মতো অপরাধকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেয়। সংবিধান-আইন-নীতি পরিমণ্ডলে চরম নৈরাজ্য কায়েম করে।

রাষ্ট্র-প্রশাসন-সমাজ-সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় ইউনূস সরকার প্রতিপক্ষ দমন ও ভিন্নমত ধ্বংস করার রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত জঙ্গি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। সরকার নতুন নতুন সন্ত্রাসী তৈরি করে, জেল থেকে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিদের ছেড়ে দেয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত জঙ্গিদের বাংলাদেশে বারবার প্রকাশ্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয়। ধর্মান্ধ-জঙ্গি-দলবাজ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অবাধে তাণ্ডব করার লাইসেন্স দিয়ে এবং অপরদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে ইউনূসের সরকার সারা দেশে এক ভয়ংকর গুন্ডাতন্ত্র কায়েম করে।

ইউনূস সরকার বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মীমাংসিত ভিত্তির ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, জাতীয় সংগীত, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-ইতিহাস-স্মারক-ম্যুরাল-ভাস্কর্য-বঙ্গবন্ধুভবনসহ সবকিছুর ওপর প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় মদদে হামলা পরিচালনা করা হয় এবং ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ভাবাদর্শ দ্বিজাতি তত্ত্বকে রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা ও হামলার শিকার হতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বঘোষণা দিয়ে এসব আক্রমণ পরিচালনা করা হয়।

ইউনূস সরকার মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির পক্ষ নিয়ে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক শক্তির ওপর চরম রাজনৈতিক দমন ও নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান শুরু করে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে গায়ের জোরে বেআইনিভাবে উল্টে দিয়ে, ট্রাইব্যুনালের আগের বিচারে দণ্ডিত চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার বন্ধ করে দিয়ে ও যুদ্ধাপরাধীদের আইনজীবীদের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেই আদালতেই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক জাসদ সভাপতি জাতীয় বীর হাসানুল হক ইনুসহ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করে প্রহসনমূলক বিচার শুরু করে। আদালতের ভেতরে ও বাইরে কথিত অভিযুক্তদের আইনজীবীদের সরকারি আইনজীবীগণ প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া শুরু করেন। তড়িঘড়ি করে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিচারিক হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করে।

ইউনূস সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সর্বনাশা গুন্ডাতন্ত্রের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করেছে—(ক) দলবাজ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, (খ) পেশাদার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, (গ) ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও (ঘ) জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ইউনূস সরকার সরাসরি এদের পক্ষ অবলম্বন করে, এদেরকে মুক্তি-প্রশ্রয়-আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয় এবং দেশব্যাপী পূর্ব ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বারবার লেলিয়ে দেয়।

সংক্ষেপে ইউনূসের সরকারের ক্ষমতারোহণ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ, বাংলাদেশের জন্মশত্রু-চিরশত্রু-পাকিস্তানপন্থি ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদি শক্তির উত্থান, মবের মুল্লুক কায়েম করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং নির্লজ্জভাবে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া।

উল্লিখিত প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকায় জাসদ জাতীয় কমিটির সভা আয়োজন করে। সভায় প্রথম অগ্রাধিকার ও প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবে দেশের বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে বলা হয় যে, ইউনূস সরকার দেশের সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও সকল বিশৃঙ্খলার মধ্যে “চরম আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” সকল নাগরিককে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ঠেলে দিয়েছে। সভায় স্পষ্ট করে বলা হয়, যেহেতু চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে ইউনূস সরকার, যেহেতু ইউনূস দায়ী, তাই বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় আনতে সর্বপ্রথম করণীয় ইউনূস ও তাঁর সরকার অপসারণ করা। জাসদের এই সভা দ্বিতীয় প্রধান কর্তব্য হিসেবে ইউনূসের সরকার অপসারণের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে জনগণের সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠায় দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানায়। জাসদের জাতীয় কমিটির সভা উল্লিখিত দাবিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির প্রতি আহ্বান জানায়।

একুশ.

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অপরাপর দলের মতো জাসদের ওপরও ইউনূস সরকারের লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসী বাহিনী ৫ আগস্ট থেকে চরম আক্রমণ পরিচালনা করে; উল্লেখ করা প্রয়োজন, এর আগে ৩ আগস্ট জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের ওপর ধানমন্ডিতে সন্ত্রাসীরা হামলা পরিচালনা করে; ৫ আগস্টের পর তাঁর বাসভবনেও হামলা করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে জাসদ নেতাদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়, জেলায়-জেলায় জাসদ কার্যালয় দখল করে নেওয়া হয়, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ২৬ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় ও তাঁর বিরুদ্ধে সারা দেশে ১১৮টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এ সময় এমনকি ২০১৬ সালে জাসদ ত্যাগীরা ইউনূস সরকারের ঐকমত্যের দোসর হয়ে ইউনূসের লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসী বাহিনীর সহায়তায় ঢাকায় ৩৫-৩৬ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অবস্থিত জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল করে নেয়। পরে দেশে-বিদেশে জাসদের সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতায় জাসদ কার্যালয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

ইউনূসের দুঃশাসনের কালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শতভাগ হরণ করা হলেও চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেও জাসদ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ও দুর্ঘটনার বিষয়ে আলাদা আলাদাভাবে অফিশিয়াল বিবৃতি প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্য প্রচার অব্যাহত রাখে। ৩২টি রাজনৈতিক দল ইউনূসের গণবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে শামিল হলেও জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি ও সাবেক ১৪ দলের আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল এতে যোগ দেয়নি।

শুরু থেকেই জামায়াতের সমর্থনে ইউনূস দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার বিভিন্নমুখী চেষ্টা চালালেও তাঁর দুঃশাসনে অতিষ্ঠ বাংলাদেশে তাঁর দ্রুত অপসারণের দাবি জোরদার হতে থাকে। দেশের ও জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার একটি অযোগ্য ও ব্যর্থ দেশবিরোধী সরকার হিসেবে চিহ্নিত হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি প্রবল হতে থাকে।

ইউনূস সরকার জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়ে কৌশলে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেয়। এই লক্ষ্য অর্জনে নির্বাচন কমিশন কেবলমাত্র ইউনূসের বাছাইকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা পরিচালনা করে। ওয়ার্কার্স পার্টি নিজ উদ্যোগে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নির্বাচন সংস্কার বিষয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করে। জাসদ ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মতবিনিময় করে এবং লিখিতভাবে নির্বাচনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোকপাত করে। জাসদ তার বক্তব্য কমিশনের নথিভুক্ত করে।

জাসদ নির্বাচন কমিশনকে জানায় যে, “নির্বাহী কার্য পরিচালনার” সীমা অতিক্রম করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের “গণভোট” আয়োজনের মতো কোনো “নীতিগত” সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার নেই, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৪(১)(খ) অনুসারে গণভোট আয়োজন বিষয়ে কোনো অধ্যাদেশ জারি করা অসাংবিধানিক, সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দশম ভাগের “সংবিধান সংশোধন” বিষয়ক অনুচ্ছেদ ১৪২(ক)(আ) অনুযায়ী অসাংবিধানিক, এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংবিধান লঙ্ঘনের মতো কোনো অসাংবিধানিক ও বেআইনি কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া সমীচীন নয়।

জাসদ নির্বাচন কমিশনকে জানায় যে, একদিকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এক পক্ষকে সকল আইনের ঊর্ধ্বে রেখে “ইনডেমনিটি” বা “দায়মুক্তি” প্রদান করে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং অন্যদিকে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাজার হাজার গায়েবি মামলা দায়ের করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ ভণ্ডুল করে দেওয়া হয়েছে।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির ওপর দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও যেসব মামলার রায় হয়েছে সেগুলো বাতিল করা ছাড়া জাতীয় সংসদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না বলে জাসদ মত প্রকাশ করে। এ ছাড়া জাসদ ও অপরাপর রাজনৈতিক দলের কার্যালয় সন্ত্রাসীদের দখলমুক্ত করা, ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পাওয়ার বা নির্বাচন করার কোনো অধিকার না দেওয়া, লুণ্ঠিত অস্ত্রসহ সকল অস্ত্র পুনরুদ্ধার করা ও মব সন্ত্রাস শতভাগ দমন করার মাধ্যমে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবি জানায়।

তারপরও ইউনূস সরকার তাদের নিরাপদ প্রস্থান এবং তাদের সকল বেআইনি ও অবৈধ কার্যক্রমের দায়মুক্তি পাওয়ার শর্তে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের দেশে-বিদেশে বিতর্কহীনভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যথাক্রমে কমপক্ষে ৪৪.২৪%, ৫৪.৬৬%, ৪৭.৭৪% ও ৫৬.০৫% ভোটপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি এবং এগুলোর বাইরেও আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একতরফা ও এক পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির নির্বাচন আয়োজন করে। এই একতরফা নির্বাচনের পর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিএনপি ও জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রার্থীগণও নির্বাচনী ফলাফল পরিবর্তন ও আসন ভাগাভাগির অভিযোগ উত্থাপন করেন। নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে।

বাইশ.

ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধের একটি হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক স্বার্থগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাংলাদেশকে যুক্ত করা। মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ইউনূস সরকার অত্যন্ত গোপনে বাণিজ্য চুক্তির নামে আমেরিকার সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থবিরোধী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যে চুক্তির ফলে জাতীয় অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ চরম বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়—চুক্তির ধারাগুলো বাংলাদেশের জন্য এতটাই অবমাননাকর যে সেগুলো যেন কোনো যুদ্ধে পরাজিত পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিজয়ীদের সর্বব্যাপক আধিপত্য কায়েমের উল্লাস।

বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ৪ মার্চ বুধবার জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল এবং এতে তাঁদের সম্মতি ছিল।

তেইশ.

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, “অবৈধ, অসাংবিধানিক, মবতান্ত্রিক ইউনূস সরকারের বিদায় এবং একতরফা ও একপাক্ষিক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী নাটকের মধ্য দিয়ে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ দেশের জন্য মন্দের ভালো।”

এই বিবৃতিতে “নতুন সরকারকে অবিলম্বে মবতন্ত্রের অবসান করা, সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত করা, ‘গায়ের জোরে উল্টে দেওয়া আইসিটি’তে প্রতিহিংসামূলক বিচার কার্যক্রমসহ অবৈধ ইউনূস সরকারের গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপ ও কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিল ঘোষণা করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় বন্দি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দেওয়া, সকল রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং দেশে রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা, শান্তি, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়।”

চব্বিশ.

একতরফা ও এক পক্ষের মধ্যে ভাগাভাগির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বিএনপি সরকার এখনও ইউনূস সরকারের অনুসৃত নীতির বাইরে যেতে পারেনি; বরং ক্ষেত্রবিশেষে ইউনূস সরকারের সম্প্রসারণ হিসেবে আচরণ করছে।

আইসিটিতে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলার আটটি অভিযোগের একটিও সরকার পক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে না পারলেও ৩০ জুন ২০২৬ এক ফরমায়েশি রায়ে হাসানুল হক ইনুর ত্রিশ বছর কারাদণ্ড ও তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিতে না পেরে রায় প্রদানের একদিনের মধ্যে সরকার তাঁকে শাপলা চত্বর মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে তাঁকে শাপলা চত্বর মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইউনূস সরকারের বিদায় নেওয়ার আট মাস পরও দেশে এখনও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, বারবার গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, শিল্প-কলকারখানা-কৃষি উৎপাদন এখনও স্থবির, কলকারখানা চালানোর অর্থনৈতিক পরিবেশ এখনও পুনরুদ্ধার না হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন, মব-রাহাজানি-চাঁদাবাজি-হত্যা-ধর্ষণ-বলৎকার এখনও নৈমিত্তিক বাস্তবতা। ইউনূস সরকারের তৈরি করা জনজীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার অবসান এখনও হয়নি।

আমেরিকার সঙ্গে ইউনূস সরকারের স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি বহাল রয়েছে এবং সেটার সর্বগ্রাসী আক্রমণের কবল থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ না নিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সরকারি ক্রয়নীতি উপেক্ষা করে আমেরিকার কাছ থেকে বোয়িং ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনা হয়েছে। ইউনূস সরকার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বদলি খেলোয়াড় বানিয়ে দেশকে যেভাবে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক সংঘাতের বিপজ্জনক টার্গেটে পরিণত করেছে, জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-স্বার্থ-প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেখান থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধারের কার্যকর কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।

এই বিষয়গুলোর সঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক তিনটি ঘোষণা ও পদক্ষেপের প্রায়োগিক দিক কেমন হবে তা থেকেও আরও স্পষ্ট হবে বাংলাদেশ জন্মের মহত্তম রাজনৈতিক ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে বিএনপি অতীতের অবস্থান বজায় রাখবে নাকি আগামী দিনে নতুন করে ভাববে।

প্রথমত, ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন ২০২৬’ প্রণয়নের কালে এই আইন থেকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আসলে বিএনপি এই দলগুলোর একাত্তরের ভূমিকাকে অস্বীকার না করে ও বর্তমানের রাজনৈতিক মিত্রতা না ভুলে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে এবং ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন নেজামে ইসলামী’ ও ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’ শব্দগুলো যোগ করে দলগুলোর তখনকার ঐতিহাসিক ভূমিকা স্পষ্ট করে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না।” এটা কি তাঁর রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নাকি সত্যিই তিনি এই “চরমপন্থা বা উগ্রবাদ”-এর আওতায় সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিদের বুঝিয়েছেন, তা আরও পর্যবেক্ষণ দাবি করে।

তৃতীয়ত, বিএনপির আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) আইন ২০২৬’ প্রণয়নের আগে সংসদে শরিয়া আইন সম্পর্কে ও পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কোরআন ও সংবিধান বিষয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা কি বিএনপি দল হিসেবে ধারণ করে? আইনমন্ত্রী বলেছেন যে, (ক) কোরআন নিজে সংবিধান নয়, (খ) কোরআন অপরিবর্তনীয় ও সংবিধান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পরিবর্তনশীল, এবং (গ) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার জন্য এমন একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন, যা নাগরিকদের সর্বজনীন সিভিল আইনি অধিকার পরিচালনা করে।

পঁচিশ.

২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপির শাসনামলে এমন কোনো পরিস্থিতির এমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, যাতে করে বলা যায় যে সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ-দুর্নীতি-লুটপাট-সিন্ডিকেট-দলবাজি-দলীয়করণ-সন্ত্রাস-বৈষম্য পরিস্থিতির কোনো গুণগত উত্তরণ ঘটেছে। ফলে গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জাসদ যে রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করেছে, তার সমকালীনতা নাকচ হয়ে যায়নি, বরং অধিকতর প্রাসঙ্গিক হয়েছে। উপরন্তু সংকট যত গভীর হবে, জাসদের ঘোষিত রাজনৈতিক নীতি-কৌশলের প্রাসঙ্গিকতা তত বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে বিদ্যমানতা তা কেবলমাত্র কোনো দল বা নেতার সংকট ও বিপর্যয় নয়, সামগ্রিক জাতীয় সংকট ও বিপর্যয়। এই জাতীয় সংকট ও বিপর্যয় মোকাবিলা করে বাংলাদেশ পুনরুদ্ধারের জাতীয় পুনর্জাগরণ সংগঠিত করার বিকল্প নেই। জাসদ এই বিপর্যয়ের মধ্যেও আত্মরক্ষা ও অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল নিয়ে বাস্তব অবস্থা বুঝে দলের রাজনৈতিক সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে। জাসদের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকগণ দলের প্রতি যে বিশ্বস্ততা, আস্থা, আনুগত্য প্রকাশ করেছেন তা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের জাতীয় প্রতিনিধি সভায় সরকার দলীয় মবের হামলার মধ্যেও কোনো ধরনের উসকানির ফাঁদে পা না দিয়ে দলের নেতা-কর্মীগণ অসীম ধৈর্য, সহনশীলতা ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও গণমাধ্যমে রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতা বিষয়ে অনেক ধরনের আলাপ-আলোচনা শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতিতে জাসদকে সুমহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো সংহত ও বিকশিত করার লক্ষ্য নিয়ে অতীতের মতো আপসহীন ভূমিকা পালন করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

লেখক: জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।