আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে আর্জেন্টিনা মহাতারকা লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ ম্যাচকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা। আকাশি-সাদা জার্সিতে ফুটবল জাদুকরের স্মৃতিঘেরা এই বিদায়ী মুহূর্তের অংশ হতে পারা প্রতিপক্ষ দল বেনিনের খেলোয়াড়দের জন্যও এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রতিপক্ষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে ফুটবলের এই রাজাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ বেনিনের গোলরক্ষক মার্সেল দঁজিনু।
বুধবার সকালে বুয়েনস এইরেসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার দেশ বেনিন। উৎসবমুখর আবহ ও আবেগঘন পরিবেশ ঘিরে ম্যাচটির আয়োজন করা হলেও নিজেদের পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে পিছু হটতে নারাজ আফ্রিকার দলটির গোলরক্ষক দঁজিনু। তার অবস্থান এক কথায় পরিষ্কার—বুয়েনস এইরেসের মাঠে মেসি ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ডদের যেকোনো মূল্যে গোল পাওয়া থেকে বিরত রাখা।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিমিয়ার ডিভিশনের ক্লাব ক্রুগার ইউনাইটেডের হয়ে খেলা এই গোলরক্ষক বুয়েনস এইরেসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছিল যে, আর্জেন্টিনায় বেনিন দলের আবাসন নিয়ে নানামুখী বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। হোটেলে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং অনুশীলনসংক্রান্ত জটিলতায় দলটির প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে খবর বের হয়।
তবে এসব গুঞ্জন সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে দঁজিনু বলেন, ‘আমরা কোনো সংকটে পড়িনি। বুয়েনস এইরেসে আমরা যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যে আছি। কেন যে এসব মুখরোচক কথা ছড়ানো হচ্ছে! সত্যি বলতে, আমরা অত্যন্ত চমৎকার ও পেশাদার পরিবেশে অবস্থান করছি।’
মেসির বিপক্ষে একই সবুজ গালিচায় খেলার সুযোগকে জীবন বদলানো ঘটনা মনে করলেও দেশের জাতীয় পতাকা ও সম্মানের বিষয়টিকেই সবার ওপরে রাখছেন বেনিনের এই তারকা। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি অন্য যেকোনো সাধারণ ম্যাচের মতো নয়। এটি লিও মেসির শেষ ম্যাচ, তাই এমন সুযোগ জীবনে একবারই আসে। তবে আর্জেন্টিনা বা মেসির মুখোমুখি হওয়া যত বড় রোমাঞ্চকর ঘটনাই হোক না কেন, আমরা এখানে কেবল ভক্ত হতে আসিনি; দেশের হয়ে সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিতে এসেছি।’
ম্যাচে নিজেদের লড়াইয়ের সংকল্প তুলে ধরে দঁজিনু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘আমরা বেনিনের হয়ে রক্ত ঘামাতে এসেছি। ফুটবলে সবসময় এগারো জনের বিরুদ্ধে এগারো জন লড়াই করে। ফলাফল জয়, ড্র বা হার—যেকোনোটি হতে পারে, দিনশেষে এটি খেলা। কিন্তু আমরা আর্জেন্টিনায় পর্যটক হয়ে ঘুরে বেড়াতে আসিনি; আমরা লড়াই করতে এসেছি। এটি আমাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন হতে যাচ্ছে।’
অবশ্য মেসিকে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত আবেগ ও শৈশবের ভালোবাসার কথা লুকাননি দঁজিনু। সাক্ষাৎকারে অকপটে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে লিও ফুটবলের অন্যতম এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাকে খেলতে দেখে আমরা বড় হয়েছি, শিখেছি। তিনি আমাদের অনেকেরই প্রিয় খেলোয়াড়। একই মাঠে তার মুখোমুখি হওয়া কল্পনার মতো। তিনি এই খেলার অবিসংবাদিত রাজা।’
তবে বিশ্বসেরা এই তারকাকে বিদায়ী উপহার হিসেবে কোনো গোল উদারভাবে উপহার দেবেন কি না—সংবাদমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে দঁজিনুর পেশাদার অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি জানান, ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে যদি আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায় এবং শট নিতে মেসি নিজে এগিয়ে আসেন, তবে তিনি তা ঠেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। দঁজিনুর মতে, ‘হিসাব একদম সহজ—আমি একজন গোলরক্ষক, গোল আটকানোই আমার প্রধান কাজ। মেসিকে কোনো কিছু এমনিতে উপহার দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তিনি গোল করতে চাইলে নিজের যোগ্যতা দিয়েই আদায় করে নেবেন।’
এর বাইরেও হাস্যরসের আবহ তৈরি হয় মেসির ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি সংগ্রহ করা নিয়ে। বেনিনের ফুটবলারদের মধ্যে জার্সির ব্যাপক চাহিদার কথা জানিয়ে দঁজিনু মজা করে বলেন, ‘আমাদের দলের সবাই মেসির একটি করে স্মৃতিচিহ্ন চায়। আয়োজকরা যদি আমাদের ২৩ জনের জন্য আলাদা ২৩টি জার্সি উপহার হিসেবে দিতেন, তবে সংঘাত এড়ানো যেত! কারণ একজন মাত্র ফুটবলার মেসির জার্সি পাবে—এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুবই কঠিন হতে যাচ্ছে।’
সবশেষে মেসি সর্বকালের সেরা কি না—এমন প্রশ্নে আর্জেন্টাইন মহাতারকার পাশাপাশি সমকালীন আরেক কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নামও স্মরণ করেন তিনি। দুই মহাতারকার অবদানের কথা স্বীকার করে দঁজিনু বলেন, ‘আমরা মেসি ও রোনালদো দুজনকেই দেখে বড় হয়েছি। দুই দশক ধরে তারা খেলাটিকে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তবে লিওর কথা আলাদা, তিনি নিশ্চিতভাবেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রকৃত রাজা।’


