মোংলা বন্দরে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে বড় বড় খণ্ডে কেটে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কাস্টমসের পরীক্ষায় দেখা গেছে, চালানে থাকা অংশগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ও অপরিহার্য যন্ত্রাংশসহ এমনভাবে কাটা হয়েছে, যা পুনরায় সংযোজন করলে প্রায় পূর্ণাঙ্গ গাড়ির রূপ দেওয়া সম্ভব।
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটি বলেছে, চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরীক্ষায় পাওয়া উপকরণগুলোর বিন্যাস ও সংযুক্ত অংশ বিবেচনায় এগুলোকে সাধারণ যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে জানা যায়, চালানটির মাধ্যমে চারটি পৃথক বিলাসবহুল গাড়ির বিভিন্ন অংশ দেশে আনা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০ আই, ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাবে চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, পুরো চালানটির ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা এবং শুল্ক-করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয় ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা। গাড়িগুলো যদি পৃথক যন্ত্রাংশ হিসেবে না ধরে আইন অনুযায়ী আংশিক সংযোজিত মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়, তাহলে প্রযোজ্য শুল্ক-কর এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস এবং পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খুলনার এসটি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে চালানটি মোংলা বন্দরে আসে।
চালানে ১৪ ধরনের পণ্যের মোট ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ২ হাজার সিসি পেট্রোল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইললাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল, বাম্পারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।
পরিদর্শনে গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, সামনের কাটা অংশের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ, সংবেদক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও সম্পূর্ণ পেছনের অংশ, কোথাও সামনের ও পেছনের অংশ এবং কোথাও ছাদ কাটা প্যানেলসহ বড় আকারের কাঠামোগত অংশ পাওয়া যায়।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণ ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন অংশ আলাদা ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার কথা। কিন্তু এই চালানে পাওয়া অংশগুলোতে গাড়ির মৌলিক কাঠামোর পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংযুক্ত ছিল। ফলে এগুলোকে সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে আমদানির বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
চারটি শনাক্ত গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য সম্পর্কে কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাব হলো—
| গাড়ির নাম | মডেল বছর | আনুমানিক বাংলাদেশি বাজারমূল্য |
|---|---|---|
| রেঞ্জ রোভার ভোগ | ২০১৭ | ১ কোটি ৬০ লাখ–১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা |
| বিএমডব্লিউ ৬৫০ আই | ২০১০ | ৬০–৯০ লাখ টাকা |
| লেক্সাস এলএক্স৫৭০ | ২০১৬ | ২ কোটি–৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি |
| টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট | উল্লেখিত নয় | ৩০–৪৫ লাখ টাকা |
| চার গাড়ির মোট সম্ভাব্য মূল্য | — | প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ–৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তার বেশি |
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষণায় প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৭৪৩৩ টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ১৯ হাজার ৫৭৭ টাকা ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর ওপর শুল্ক-কর বাবদ ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা পরিশোধযোগ্য দেখানো হয়।
তবে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, গাড়িগুলোকে কোন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে শুল্কায়ন করা হবে। কাস্টমসের অনুসন্ধানে যদি প্রমাণিত হয় যে এগুলো প্রকৃতপক্ষে আংশিক সংযোজিত মোটরযান, তাহলে ঘোষিত যন্ত্রাংশের পরিবর্তে সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টি সামনে আসবে। সে ক্ষেত্রে গাড়ির প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, মডেল বছর, বয়স, অবচয় এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর বিবেচনায় নিয়ে রাজস্বের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করা হবে।
শুল্ক আইনের শ্রেণিবিন্যাসসংক্রান্ত বিধানে কোনো পণ্য অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত অবস্থায় থাকলেও তার মধ্যে সম্পূর্ণ পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা অপরিহার্য চরিত্র বিদ্যমান থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। কাস্টমসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চালানে পাওয়া গাড়ির অংশগুলোর ধরন, সংযোগ এবং বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চারটি গাড়ির ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ মোটরযানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
ফলে চালানটি এখন শুধু ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। আমদানিপদ্ধতি, পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস এবং এর বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর—সবকিছুই নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও শ্রেণিবিন্যাসের পরই সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকি বা অতিরিক্ত শুল্ক-কর কত হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যাবে।


