রবীন্দ্রনাথের ছবিতে চুনকালি: জামিন শুনানিতে আইনজীবীদের হাতাহাতি, আসামিরা কারাগারে

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আল-নূর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমির জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে ঢাকার আদালতকক্ষে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু হয় হাতাহাতি ও মারামারি। বিচারকের সামনেই এই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে, যার একপর্যায়ে একজন আইনজীবীর শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সিএমএম বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যেতে বাধ্য হন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১০ অক্টোবর। রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন আল-নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ চারজন। সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শাহবাগ থানা পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। চার্জশীটে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং সমাজে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ গ্রেপ্তারের পরদিন আসামিদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন জানালে আদালত আয়াসসহ দুই আসামির তিন দিন এবং অপর দুই আসামির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
রিমান্ডের মেয়াদ শেষে বুধবার শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল গাফফার হিমেল আসামি আয়াস ও মারজিয়া খন্দকারকে আবার সিএমএম আদালতে হাজির করেন। তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানিয়ে আদালতকে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের কাছ থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক সদস্যদের বিষয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামিদের নাম-ঠিকানা সম্পূর্ণ যাচাই-বাছাইয়ের স্বার্থে তাঁদের জামিন না দিয়ে জেলহাজতে রাখা একান্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসাইন জামিনের জোর দাবি জানিয়ে আদালতে যুক্তি দেন যে, মামলায় যেসব ধারা যুক্ত করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। আসামি আয়াস মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন এবং মারজিয়া খন্দকার একজন দুগ্ধপোষ্য সন্তানের মা। মানবিক দিক বিবেচনায় তাঁদের জামিন দেওয়া উচিত। আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, আসামিদের মূল ক্ষোভ ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। দেয়ালে বিদেশি বা ভারতীয় শিল্পীদের ছবি থাকায় তাঁরা দেশীয় সংস্কৃতির পক্ষে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মাত্র।
এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি বলেন, সংস্কৃতি ও শিল্পের নামে রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরণ্যে ব্যক্তিত্বের ছবিতে কালি দেওয়া সরাসরি উসকানিমূলক কাজ। হিন্দু সম্প্রদায়কে ক্ষিপ্ত করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এই ঘৃণ্য কাজ করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভাইরাল হওয়ার সস্তা মানসিকতা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনবরত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের এই বক্তব্যের একপর্যায়ে এজলাসে উপস্থিত এক আইনজীবী উচ্চ শব্দে প্রতিবাদ জানালে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা চরম রূপ নেয়।
একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে পরিণত হয়। ধস্তাধস্তির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায়। বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে বিচারক এজলাস ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যস্থতায় বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে আদালত আবার শুরু হলে বিচারক উভয় আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।