কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ২৪ বছর বয়সী মো. সাগর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাশিয়ায় অবস্থানরত সাগরের এক বন্ধু মুঠোফোনে তাঁর বোনকে মৃত্যুর খবর দেন। তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। পরিবারের সদস্যরা ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকাহত হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা মো. কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার আগে সাগর চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে ভ্যান চালাতেন। পাশাপাশি রিকশা চালিয়েও উপার্জন করতেন। সীমিত আয়ে সংসারে সহায়তা করার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা ছিল তাঁর। সেই লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দোকানের ম্যানেজারের সহযোগিতায় রাশিয়ায় যান তিনি। বিদেশে যাওয়ার জন্য তাঁকে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবার।
রাশিয়ায় পৌঁছে একটি বেকারিতে কাজ নেন সাগর। সেখানে তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকা। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, নিয়মিত আয় করে তিনি ঋণের বোঝা কমাবেন এবং একসময় পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।
বেকারির চাকরি থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে
পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় অবস্থানকালে সাগরের পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে। ওই ব্যক্তি তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভন দেখান এবং এ জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সাগর বেকারির চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
চলতি বছরের মে মাসে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেন বলে পরিবারের ভাষ্য। এরপর থেকেই তাঁর সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গত চার থেকে পাঁচ মাসে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। দীর্ঘ সময় ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন তাঁরা।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, সাগর যখন বেকারির চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তখন পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, রাশিয়ায় থাকা এক দালাল ভুল তথ্য দিয়ে সাগরকে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। পরিবারের আশঙ্কা, বিদেশে চাকরির আশায় যাওয়া তরুণটি পরিস্থিতির জটিলতা বুঝে ওঠার আগেই বিপজ্জনক এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
শনিবার রাশিয়ায় থাকা সাগরের এক বন্ধু তাঁর বোনকে ফোন করে মৃত্যুর খবর জানান। তবে ঠিক কোথায়, কখন এবং কী পরিস্থিতিতে সাগরের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবার বিস্তারিত কিছু জানতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর খবরের স্বাধীন ও আনুষ্ঠানিক সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন বাবা
সাগরের বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। একসময় তিনি সবজির ব্যবসা করতেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে পরিবারের ভরণপোষণ চালানোর পাশাপাশি ছোট ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। সেই আশাতেই ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন।
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ভেঙে পড়েছেন তিনি। কবির হোসেন বলেন, ‘সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধার-দেনা করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছি। ৪-৫ মাস যাবৎ ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারি নাই। এখন শুনি আমার ছেলে আর নাই।’
একজন অসুস্থ বাবার কাছে বিদেশে কর্মরত ছেলের আয় ছিল পরিবারের দুরবস্থা কাটানোর সম্ভাবনা। সেই ছেলেকে ঘিরে থাকা আশা এখন গভীর শোক ও অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। সাগরের বিদেশযাত্রায় নেওয়া ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, সেই প্রশ্নও পরিবারের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিদেশে চাকরির প্রলোভন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
সাগরের ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিদেশে গিয়ে চাকরির পরিবর্তে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়া, মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন এবং কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে অস্পষ্টতা—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
তবে সাগরকে কী ধরনের চুক্তির মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছিল, তিনি স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন কি না কিংবা তাঁকে কোনোভাবে বাধ্য করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, যোগাযোগের তথ্য এবং রাশিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া, কাজের লিখিত চুক্তি, ভিসার ধরন এবং নিয়োগকর্তার পরিচয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মধ্যস্থতাকারী অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ দাবি করলে কিংবা মূল চাকরির বাইরে অন্য কোনো কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থানের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানিয়েছেন, তাঁরা এখনো ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে তিনি জানান।
সাগরের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা, তাঁর অবস্থান ও মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিবারকে সহায়তা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সাগরের মৃত্যুর বিষয়ে সরকারি নিশ্চিতকরণ, তাঁর মরদেহের অবস্থান কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য জানা যায়নি।
পরিবারের কাছে সাগর ছিলেন আর্থিক অনটন থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখা এক তরুণ। বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর যে আশা নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই যাত্রার পরিণতি এখন এক অনিশ্চিত শোকের গল্প। তাঁর মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং কীভাবে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছালেন, তা খতিয়ে দেখা—দুটিই এখন জরুরি।


