আজকের (৬ অক্টোবর, ২০২৬) প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত “অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: বিনিয়োগ বাড়ছেই না কেন” শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে অর্থনীতিবিদ ডঃ বিরূপাক্ষ পাল প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন,
“রংধনু জাতি তৈরি করতে হলে সাতটি রংয়ের প্রয়োজন । তিন রং দিয়ে হবে না ।”
তিন রং বলতে ড. পাল তিনটি রাজনৈতিক দলকে (জামাত-বিএনপি-এনসিপি) বুঝিয়েছেন কিনা আমি জানিনা । তবে আমি নিশ্চিত কালো,ধূসর এবং গাঢ় সুরমায়ী এই তিনটি রং একসাথে মিশিয়ে বা পরপর সাজিয়ে অমাবস্যার বা চন্দ্রগ্রহনের ছবি আঁকা গেলেও “রংধনু” আঁকা যাবে না।
১০ ডিসেম্বর ২০২২ গোলাপবাগ মাঠে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি তার অতি বাম থেকে আরম্ভ করে অতি ডান মিত্রদের নিয়ে ২৭ দফা “রাষ্ট্র মেরামত” কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন । এর আদল অনেকটা মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের(১৯৩৬-১৯৮১) ১৯ দফা কর্মসূচির মত । সকলকে নিয়ে ( এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদেরও ) জাতি পুনর্নির্মাণের একটা ইঙ্গিত ১৯ দফাতেও ছিল । ১৯৭৭ সালের ৩০শে এপ্রিল ঘোষিত দফাগুলোতে সব মতের লোকদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার যে ঘোষণা জেনারেল জিয়াউর রহমান দিয়েছিলেন তারই আজকের রূপ হচ্ছে “রেইনবো নেশন” । ২৭ দফার দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশকে একটা “রংধনু জাতিতে” পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডক্টর খন্দকার মোশারফ হোসেন । কয়েক বছর আগের ব্যাপক সাড়া জাগানো (অথচ কার্যত ব্যর্থ ), সড়ক আন্দোলনের স্কুল ছাত্রদের মতো করে “রাষ্ট্র মেরামতের” এই অন্যতম দফাটিতে বলা হয়েছে, “প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠা করা” হবে । যেমনটি ঘোষণা করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩) । প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রথম মাসেই তিনি এই ঘোষণা দেন । মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার শান্তিতে নোবেলজয়ী বিশপ ডেসমন্ড টুটোই (১৯৩১-২০২১) ১৯৯৪ সালে প্রথম এই দুই শব্দের বাক্যাংশটি (রেইনবো নেশন) চয়ন করেছিলেন । এ বিষয়ে তিনি কয়েকটি টিভি অনুষ্ঠানে তাঁর ধারণা বিস্তৃত করেছিলেন । ‘Old Testament’ -এ বর্ণিত নুহ্ নবীর বন্যার সময় ব্যবহৃত নৌকাটিকে তিনি রূপালঙ্কার (মেটাফোর *) হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন । নুহ্ নবীর নৌকায় পাপীদেরকে তোলা হয়েছিল কিনা জানিনা, তবে পাপীদের তোলা হয়ে না থাকলে পরবর্তী সময়ে দুনিয়াতে পাপীরা আসলো কোত্থেকে এই সন্দেহ থেকেই যায়। লক্ষনীয় বিএনপি ঘোষিত রেইনবো নেশনেও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্বাসীদের কি অবস্থান হবে তা এখন স্পষ্ট নয়।
টুটোর ধারণার আরো বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা বলেন, “Each of us is as intimately attached to the soil of this beautiful country as are the famous Jacaranda trees of Pretoria and the Mimosa trees of the Bushveld- a rainbow at peace with itself and the world…।”
বহু জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত বহু ভাষাভাষী (দক্ষিণ আফ্রিকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ভাষার সংখ্যা ১৩ টি) একটা দেশকে সুসংঘটিত করার জন্য ম্যান্ডেলার এই উদ্যোগ যথার্থই ছিল । ম্যান্ডেলা তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকাকে বহু বর্ণে বর্ণিল একটি রংধনু জাতি হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশের মত হতে চাওয়া অথবা বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের মত হয়ে যাবে এরূপ বলা তেমন নতুন কিছু নয় । যেমন এই দেশে একসময় স্লোগান শোনা গিয়েছিল, “… বাংলা হবে আফগানিস্তান”, “তোয়াব ভাই তোয়াব ভাই চাঁদ- তাঁরা পতাকা চাই “, অথবা কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কা যখন চরম আর্থিক দুর্দশায় পড়েছিল তখন অনেকেই বলেছিল আমরা শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়া হয়ে যাব । যদিও শ্রীলংকা অতি দ্রুত তাদের দুর্দশা কাটিয়ে উঠেছে । আমাদের দুর্দশা কাটছেই না । অতীতে যারা দেশকে অনেক উন্নত দেখতে চেয়েছিল তাঁরা সুইজারল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মত হতে চাইত। এইসব আলোচনায় এতদিন আমরা এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যেই ছিলাম । এই প্রথম আমরা আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম, তাও আবার দক্ষিণ আফ্রিকার অনুকরণে “রেইনবো ন্যাশন” হওয়ার নামে । আজ ক’দিন যাবত “ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন” নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, যেটা গঠন করা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে একটি ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য । মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা: জাহেদুর রহমানের আজকের (৬ অক্টোবর, ২০২৬) সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য শুনে অনেকে এমন একটি কমিশনের কথাই মনে করছেন ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তিন ‘R’ তথা-রিকভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন (দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর কালের ধারণা, যা আমার প্রিয় সহকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিষয়ের অধ্যাপক এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ তিতুমীর ভালোভাবেই জানতেন ) ফর্মুলার পরিমার্জন করে তিনিটি নতুন রণকৌশল সাজানো উচিত বলে মনে করেন ডক্টর বিরূপাক্ষ পাল। সেগুলো হচ্ছে- রিভিশন, রিফর্ম এবং রি-এনগেজমেন্ট। এরমধ্যে তৃতীয়টি অর্থাৎ রি-এনগেজমেন্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । অর্থনীতিতে সকল উদ্যোক্তা এবং কর্মীকে (যারা অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের জড়িত ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে অনেকেই বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাস্তচ্যুত বা দেশান্তরিত) দল মত নির্বিশেষে আবার উৎপাদনের সংযুক্ত করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে গেলে ঋণ করতে হবে অথবা কর বাড়াতে হবে। ঋণ করে বিনিয়োগ করলে রাষ্ট্রের জন্য অনেক দায় সৃষ্টি হবে। অপরদিকে কর বাড়লে ব্যক্তি ভোগ কমে যাবে, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। প্রবৃদ্ধি আরও গতি হারাবে।
* (মেটাফোরে কোন ব্যক্তি, বস্তু বা অন্য কোন কিছুকে এমন একটা জিনিসের সাথে তুলনা করা হয় যার সাথে এর কোন মিল নেই অর্থাৎ মেটাফোরে সাধারণত দুটি ভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে কাল্পনিকভাবে একটি সাধারণ গুণের উল্লেখ করা হয়; যেমনটা করেছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬) তাঁর “As you like it” নাটকে । ১৫৯৯ সালে রচিত এবং ১৬২৩ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম শেক্সপিয়রের এই হাস্যরসাত্মক নাটকটিতে রূপক উপমা হিসেবে পৃথিবীটাকে নাট্যমঞ্চের সাথে তুলনা করেছিলেন । উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ভাষায়,” All the world’s stage, / And all the men and women merely players; / They have their exists and their entrances /And one man in his time plays many parts,…” )
প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং পূর্বে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদের সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়; যার মধ্যে কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের উদ্যোগ অন্যতম। একজন সক্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লেখেন এবং টিভি টকশোতে মতামত ব্যক্ত করে থাকেন।


