লিওনেল মেসিও যা পারেননি, বার্সেলোনায় সেই অনন্য নজির গড়লেন রাফিনিয়া

স্প্যানিশ ফুটবলের আঙিনায় ২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরু থেকেই যেন রুদ্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া। বার্সেলোনার জার্সি গায়ে চাপিয়ে একের পর এক ম্যাচে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছেন তিনি। শনিবার রাতে সেভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিতে শুরুতেই পিছিয়ে পড়েছিল বার্সেলোনা। তবে সেখান থেকে এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখেন রাফিনিয়া। দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে দলকে ৩-১ ব্যবধানের চমৎকার এক জয় উপহার দেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। এই জয়ের ফলে লা লিগায় এই মৌসুমে নিজের প্রথম সাত ম্যাচেই তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২টিতে।
স্প্যানিশ পরিসংখ্যানবিদ মিস্টারচিপের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রাফিনিয়ার এই সাফল্য কতটা বিরল। স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে লা লিগার প্রথম সাত ম্যাচে অন্তত ১২টি গোল করার নজির রয়েছে হাতে গোনা মাত্র সাতজন ফুটবলারের। আর একবিংশ শতাব্দীতে এই তালিকায় নাম লেখানো খেলোয়াড়ের সংখ্যা আরও কম।
এর আগে ২০১৪-১৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগার প্রথম সাত ম্যাচে ১৩টি গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সেই মৌসুমে ৩৫টি ম্যাচ খেলে তিনি সর্বমোট ৪৮টি গোল জমা করেছিলেন নিজের ঝুলিতে। তবে স্প্যানিশ লিগে এই তালিকার একদম শীর্ষে অবস্থান করছেন রিয়াল ওভিয়েদোর সাবেক ফুটবলার এস্তেবান এচেভাররিয়া। বহু বছর আগে, ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে লিগের প্রথম সাত ম্যাচে তিনি রেকর্ড ১৪টি গোল করেছিলেন। অন্যদিকে, ২০১৭-১৮ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের এই রেকর্ডের কাছাকাছি গিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। বার্সেলোনার হয়ে লিগের প্রথম সাত ম্যাচে তিনি করেছিলেন ১১টি গোল। রাফিনিয়া এবার কেবল দলের সাবেক মহাতারকা মেসির সেই পরিসংখ্যানকেই টপকে যাননি, গড়েছেন নতুন এক ইতিহাস।
সেভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে রাফিনিয়ার গোলগুলো ছিল কৌশল এবং দক্ষতার নিখুঁত প্রদর্শনী। প্রথমার্ধে আন্দ্রেস ক্রিশ্চিয়ানসেনের বাড়ানো চমৎকার এক ডিফেন্স-চেরা পাস ধরে বক্সে ঢোকেন তিনি। এরপর ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে ডান পায়ের মাপা শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বার্সার বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের ভাসানো ক্রসে নিখুঁত হেড করে বল জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে আবারও সেই ইয়ামাল-রাফিনিয়া রসায়নের ঝলক দেখা যায়। ইয়ামালের চমৎকার এক পাসে সেভিয়া গোলরক্ষককে একা পেয়ে যান তিনি। এরপর অত্যন্ত চতুরতার সাথে বাম পায়ে করা আলতো চিপে প্রতিপক্ষের আশায় ছাই ঢেলে বার্সেলোনার জয় নিশ্চিত করেন।
ডান পায়ে এক গোল, মাথায় এক গোল এবং শেষটি বাম পায়ে—ফুটবলের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারফেক্ট হ্যাটট্রিক’। রাফিনিয়া শনিবার রাতে মাঠে সেই ক্লাসিক কীর্তিটিই সম্পন্ন করেছেন। বার্সেলোনার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে এই অর্জনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। কাতালান ক্লাবটির হয়ে টানা ১৭টি বছর খেলে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন লিওনেল মেসি। কত শত রেকর্ড ভেঙে নিজের নামে করেছেন তিনি, কিন্তু বার্সেলোনার জার্সিতে এমন কোনো ‘পারফেক্ট হ্যাটট্রিক’ করার সৌভাগ্য মেসির কখনো হয়নি। মেসি যা পারেননি, রাফিনিয়া বার্সেলোনার হয়ে সেই অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন।
মাঠের পারফরম্যান্সে রাফিনিয়া ইদানীং বহুক্ষেত্রেই মেসির স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এই মৌসুমে বার্সেলোনার কোচ হানসি ফ্লিক তাকে চিরাচরিত উইং ছেড়ে খেলীয় কৌশলে ‘ফলস নাইন’ বা সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে মাঠে নামাচ্ছেন। কোচের এই নতুন পরিকল্পনায় নিজেকে শতভাগ মানিয়ে নিয়েছেন রাফিনিয়া। কেন্দ্রীয় এই ভূমিকায় মুক্তভাবে খেলার স্বাধীনতা পেয়ে তিনি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন, তা এই মৌসুমের পরিসংখ্যানই পরিষ্কার করে দেয়—মাত্র ৭টি ম্যাচ খেলে ১২টি গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩টি গোল।
গত মৌসুমটা রাফিনিয়ার জন্য একেবারেই সুখকর ছিল না। ঘন ঘন চোটের কারণে নিয়মিত মাঠেই নামতে পারেননি তিনি। শারীরিক সমস্যার দরুন জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকেও ছিটকে যান। চোটের প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও তার নাম ওঠেনি। ক্যারিয়ারের এই কঠিন সময় পার করে আসা রাফিনিয়ার মধ্যে হয়তো নিজেকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে চেনানোর একটা তীব্র জেদ কাজ করছিল। শনিবার রাতের পারফরম্যান্সে ফুটবল বিশ্ব দেখল, শান্ত থেকে মাঠে পা দিয়ে নীরব জবাব দেওয়ার সেই শিল্পেই এখন বুঁদ হয়ে আছেন এই ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।