খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৯ পিএম
লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির মধ্যেই একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় ফেনীর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০০টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে ফেনী সদর ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়।
ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর নতুনটি স্থাপন করতে সময় লাগায় অনেক এলাকার গ্রাহককে দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। আগস্টের তীব্র গরমে এই পরিস্থিতি জনজীবনে বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায় পচনশীল পণ্য সংরক্ষণ করতে হয়, সেখানে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) আবদুল আউয়াল জানান, জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ফেনী সদর উপজেলায় ৫৮টি এবং ছাগলনাইয়ায় ৩৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এ ছাড়া পরশুরামে তিনটি, সোনাগাজীতে দুটি এবং দাগনভূঞায় একটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। ফুলগাজী উপজেলায় এ সময়ে কোনো ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেনি।
চুরির ধরন বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত গভীর রাতে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায়। পরে সেগুলো ভেঙে ভেতরের মূল্যবান কয়েল ও তামার তার বের করে নেওয়া হয়। ফলে শুধু একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রই চুরি হচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে পুরো একটি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।
সম্প্রতি উত্তর কুহুমা গ্রামের একটি মসজিদের ২৫ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমার চুরি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর। চুরির পর মসজিদসহ ৬৩টি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল মিথুন জানান, নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ অফিসে ৮১ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। পরে ১০ আগস্ট সোমবার বিকেলে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
ট্রান্সফরমার চুরির কারণে শুধু আবাসিক গ্রাহকরাই সমস্যায় পড়ছেন না, ক্ষতির মুখে পড়ছেন শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরাও। শিল্প মিটারের গ্রাহক আলাউদ্দিন বলেন, চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে নতুন ট্রান্সফরমার বসাতে যত সময় লাগে, ততক্ষণ ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও বেচাকেনা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি বলে জানান তিনি।
ট্রান্সফরমার চুরির পর আর্থিক দায়ভার নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম মুহাম্মদ নুরুল হোসাইন জানান, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের ট্রান্সফরমার প্রথমবার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক গ্রাহককে বহন করতে হয়। একই গ্রাহকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব পড়ে গ্রাহকের ওপর।
এ কারণে ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দ্রুত পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, চুরির পর বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দেরি হলে ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্থ জোগাড়ের চাপও তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি চুরির ঘটনায় থানায় মামলা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সতর্ক ও সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং চুরি হওয়া তারও উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
একদিকে নিয়মিত লোডশেডিং, অন্যদিকে ট্রান্সফরমার চুরির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ফেনীর গ্রাহকদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। চুরি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। পাশাপাশি চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার দ্রুত প্রতিস্থাপন করা না গেলে ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
মন্তব্য