খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪২ পিএম
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোয় প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না করে দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতন এবং পরবর্তী বছরে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর করা হতে পারে।
নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে গঠিত সচিব কমিটির সব সদস্য ইতোমধ্যে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া প্রশাসনিকভাবে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও নবম পে স্কেল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে নতুন বেতন কাঠামোকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ই-বুকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপর এর প্রভাবও উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে গঠিত এই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের সুপারিশে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ ছিল। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছিল।
এরপর কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য বেতন কাঠামোর প্রস্তাব তৈরির জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন।
বেতন কাঠামো পরিবর্তনের পেছনে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এর আগে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে বাস্তবে কতটা বেতন বৃদ্ধি হবে, কোন ধাপে তা কার্যকর হবে এবং বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতার কাঠামো কী হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
নবম পে স্কেলের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বড় পরিসরের এই বেতন সংস্কারের সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বাস্তবায়নের ধাপ, সময়সূচি ও ব্যয়ের পরিমাণই নির্ধারণ করবে নতুন বেতন কাঠামোর প্রকৃত প্রভাব।
মন্তব্য