পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে লামিয়া বৃষ্টির সঙ্গে রবিউল ছৈয়ালের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁদের সংসারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে রবিউলের মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, রবিউলের মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদ করায় লামিয়াকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সর্বশেষ ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে লামিয়া স্বামীকে মাদক সেবন ও বিক্রি বন্ধ করার জন্য বলেন। অন্যথায় তাঁকে তালাক দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
এরপর পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সোমবার বিষয়টি সমাধানের কথা বলে লামিয়াকে স্বামীর বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি মীমাংসা করা হয় বলে জানা গেছে।
তবে সালিশ শেষ হওয়ার পর অন্যরা চলে গেলে আবারও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে রবিউল লামিয়াকে বাড়ির পাশের একটি ডোবার কাছে নিয়ে যান। সেখানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর গলা কেটে হত্যার পর মরদেহ ডোবায় ফেলে রেখে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে লামিয়ার ছোট ভাই ওবায়দুল মাদবর তাঁকে খুঁজতে গিয়ে পাশের ডোবায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন। এরপর তাঁরা লামিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। লামিয়ার মা শাহিদা আক্তার অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর জামাতা রবিউল মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই মেয়েকে মারধর করতেন তিনি। নির্যাতনের ঘটনায় আগে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
শাহিদা আক্তার বলেন, মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ না করায় তাঁর মেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বামীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন। কিন্তু পারিবারিকভাবে বিরোধ মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে তাঁকে আবার স্বামীর বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়। সালিশ শেষে সবাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই মেয়েকে গলা কেটে হত্যার খবর পান তাঁরা।
মেয়ের এমন নির্মম মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন শাহিদা আক্তার। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও নির্যাতনের পরও মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঘটনার পর অভিযুক্ত রবিউল ছৈয়ালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তৎপর হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
ওসি আরও জানান, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। কী কারণে এবং কী পরিস্থিতিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে সালিশের মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার পরও এমন প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দাম্পত্য কলহ, মাদকসংক্রান্ত বিরোধ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।


