সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্ম অবমাননামূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে আটক এক সাবেক পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের করা মামলায় মঙ্গলবার তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে যে ফেসবুক আইডি থেকে বিতর্কিত পোস্টটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি ভুয়া বলে দাবি করেছেন ওই যুবক। এ বিষয়ে তিনি আগেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৪০ বছর বয়সী ওই যুবক তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের একটি গ্রামের বাসিন্দা। সোমবার দুপুরে তাঁকে নিজ গ্রাম থেকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ওই রাতেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মঙ্গলবার মামলাটিতে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ফেসবুকের একটি আইডি থেকে ধর্ম অবমাননামূলক বলে বিবেচিত একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবককে আটক করে।
তবে ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিতর্কিত পোস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডিটি ভুয়া বলে দাবি করেছেন আটক যুবক। তাঁর অভিযোগ, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ছবি ব্যবহার করে ওই আইডি খোলা হয়েছিল। সেখান থেকে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি জানিয়ে তিনি আগেই থানায় জিডি করেছিলেন এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
ফলে ফেসবুক আইডিটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, বিতর্কিত পোস্টটি কে দিয়েছেন এবং আটক যুবকের সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব বিষয়ে তদন্তের ফলাফল কিংবা ভুয়া আইডি ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আটকের সময় উত্তেজনা, পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে পুলিশ ওই যুবককে আটক করে নৌকায় তুলে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করলে পেছন থেকে কয়েকজন কিশোর ও তরুণ ঢিল ছোড়েন। এ সময় তাঁকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ দ্রুত তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বাসিন্দাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। পরে তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জুনাব আলী, মেহেদী হাসানসহ অন্যরা গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা স্থানীয়দের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানান।
সাবেক পুলিশ সদস্যের চাকরিচ্যুতির তথ্য
আটক যুবক আগে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফারুক আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ওই যুবককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
তবে তাঁর সাবেক চাকরির বিষয়টি বর্তমান মামলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করে না। ফেসবুক আইডির মালিকানা, পোস্ট প্রকাশের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং আগে করা জিডির বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো পোস্টের ভিত্তিতে দ্রুত উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো পোস্টের সঙ্গে কারও নাম বা ছবি যুক্ত থাকলেই যে তিনি সেটি প্রকাশ করেছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিশেষ করে ভুয়া আইডি ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ, পোস্ট প্রকাশের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল আলামত যাচাই করা জরুরি।
তাহিরপুরের এ ঘটনায় আটক যুবকের আগে করা জিডি, বিতর্কিত ফেসবুক আইডির পরিচয় এবং পোস্ট প্রকাশের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া এবং আটকের সময় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ এ ঘটনায় মামলা করেছে এবং আদালতের মাধ্যমে আটক যুবককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ভুয়া আইডির অভিযোগের সত্যতা কিংবা ধর্ম অবমাননামূলক পোস্টটি কে প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তদন্তের ফলাফল সামনে এলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।



