অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে ২০০ রানের গণ্ডি পেরোল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। ব্যাট হাতে ইতিহাস গড়লেন সোবহানা মোস্তারি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হলেন তিনি। অধিনায়ক নিগার সুলতানার ব্যাট থেকেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতক। কিন্তু দুই ব্যাটারের অসাধারণ প্রচেষ্টাও দলকে বড় পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। ব্রিসবেনে ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দল।
প্রথমে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ২২০ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জবাবে মাত্র ২৮.১ ওভারে এক উইকেট হারিয়েই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের হয়ে জর্জিয়া ভলের দুর্দান্ত অপরাজিত সেঞ্চুরি বাংলাদেশের বোলারদের সব প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। ফলে সোবহানার ১১৮ রানের ইনিংসটি শেষ পর্যন্ত দলের পরাজয় আড়াল করতে পারেনি।
শুরুতেই বিপর্যয়, সোবহানা-নিগারের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ানো
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চরম বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ৭.২ ওভারে ৮ রান তুলতেই সাজঘরে ফিরে যান দলের প্রথম তিন ব্যাটার। এমন বিপর্যয়ের পর বড় সংগ্রহ গড়ার আশা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। আগের ম্যাচে ১৫৩ রানে অলআউট হওয়ার স্মৃতিও তখন বাংলাদেশ দলের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল।
এই ম্যাচে ফারজানা হক শূন্য রানে আউট হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি রেকর্ডের অংশ হন। বাংলাদেশ নারী দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি বার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ডে নাহিদা আক্তারকে ছাড়িয়ে যান তিনি। নাহিদা এর আগে ১১ বার শূন্য রানে ফিরেছিলেন, ফারজানার ক্ষেত্রে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১২।
তবে শুরুতে তিন উইকেট হারানোর পরও হাল ছাড়েননি সোবহানা মোস্তারি ও অধিনায়ক নিগার সুলতানা। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে দলের ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব নেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রান তুলতে শুরু করেন তাঁরা। একদিকে সোবহানার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, অন্যদিকে নিগারের ধৈর্যশীল উপস্থিতি বাংলাদেশকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলে।
মাত্র ৬৬ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন সোবহানা। অন্য প্রান্তে নিগার শুরুতে উইকেট হারানোর চাপ সামলে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন। তাঁর অর্ধশতক আসে ৯৭ বল খেলে। পরিস্থিতির বিচারে নিগারের এই ইনিংস ছিল দায়িত্বশীল; দ্রুত রান তোলার চেয়ে উইকেটে টিকে থেকে দলকে লড়াই করার মতো অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর প্রধান কাজ।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী সেঞ্চুরি
সোবহানার ইনিংসটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগে খেলা ছয়টি ওয়ানডের কোনোটিতেই ২০০ রান করতে পারেনি বাংলাদেশ। এবার সেই বাধা অতিক্রম করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সোবহানার।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটারও তিনি। সাদারল্যান্ডের বলে দৌড়ে এক রান নিয়ে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছান সোবহানা। প্রতিপক্ষের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে এমন ইনিংস তাঁর সামর্থ্য ও চাপ সামলে খেলার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
ছেলে ও মেয়েদের ক্রিকেট মিলিয়েও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এটি মাত্র দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। এর আগে গত আগস্টে ডারউইন টেস্টে তানজিদ হাসান প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কীর্তি গড়েছিলেন। ফলে সোবহানার অর্জন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের নিজেদের মাঠে সেঞ্চুরি করা যে সহজ নয়, তা এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। সোবহানার আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন আর মাত্র সাতজন ব্যাটার। তাঁদের মধ্যে ভারতের স্মৃতি মান্ধানার নাম রয়েছে দুবার।
সোবহানার ইনিংস থামে ১৩৪ বলে ১১৮ রানে। ম্যাগান শ্যুটের বলে বোল্ড হয়ে ফেরার আগে তিনি নিজের ব্যাটিং দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁর ইনিংস সাজানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ রান ও দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থাকার সমন্বয়ে। অন্য প্রান্তে নিগার ১১৪ বলে ৭৪ রান করে অপরাজিত থাকেন। দুজনের ব্যাটে ভর করেই ৬ উইকেটে ২২০ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ।
ভল-লিচফিল্ডের জুটিতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ
২২০ রান করার পর বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার জর্জিয়া ভল ও ফিভি লিচফিল্ড সে সুযোগ দেননি। শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাটিং করে তাঁরা বাংলাদেশের বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন।
প্রথম উইকেটে মাত্র ১১৯ বলে ১৬২ রান যোগ করেন ভল ও লিচফিল্ড। এই জুটিই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। লিচফিল্ড ৫১ বলে ৭০ রান করে স্বর্ণা আক্তারের বলে হাবিবা আক্তারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরলে জুটি ভাঙে। তবে ততক্ষণে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের ভিত শক্ত হয়ে গেছে।
অন্য প্রান্তে ভল ছিলেন আরও বিধ্বংসী। ১৯টি চার মেরে মাত্র ৯৭ বলে ১৩১ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধারাবাহিক আক্রমণ, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং রান তোলার অসাধারণ গতি। বাংলাদেশের বোলাররা তাঁকে থামানোর কার্যকর উপায় খুঁজে পাননি।
মাত্র ২৮.১ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়া। হারায় তাদের মাত্র একটি উইকেট। বাংলাদেশের ২২০ রান যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারের ব্যাটিং সেই সম্ভাবনা কার্যত শেষ করে দেয়।
ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরে যে প্রশ্ন রয়ে গেল
এই ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সোবহানা মোস্তারির ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি এবং নিগার সুলতানার দায়িত্বশীল ব্যাটিং। শুরুতে মাত্র ৮ রানে তিন উইকেট হারানোর পরও দল ২০০ পেরিয়েছে—এটিও ইতিবাচক দিক। তবে ব্যাটিংয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পর বোলিংয়ে সেই লড়াই ধরে রাখতে না পারা বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।
আইসিসি নারী ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানীয় দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে শুধু বড় ইনিংস খেলাই যথেষ্ট নয়। নতুন বলে উইকেট নেওয়া, জুটিতে রান আটকে রাখা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করাও জরুরি। ব্রিসবেনের ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে এই জায়গাগুলোতেই উন্নতির প্রয়োজন স্পষ্ট হয়েছে।
সোবহানার রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু দলীয় সাফল্য পেতে হলে এমন ব্যক্তিগত অর্জনকে সম্মিলিত পারফরম্যান্সে রূপ দিতে হবে। ব্রিসবেনে বাংলাদেশ ২০০ রানের বাধা পেরিয়েছে ঠিকই, তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে আরও ধারাবাহিক ব্যাটিং, নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং উন্নত ফিল্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তাও এই ম্যাচে পরিষ্কার হয়ে গেছে।


