বুধবার সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার মধ্যে নতুন এই ঘটনাগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পূর্বাঞ্চলীয় ধারান শহরে অবস্থিত আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালানো হয়। এতে ভবনটিতে সীমিত আকারে আগুন ধরে যায়। তবে এ ঘটনায় কেউ নিহত হননি বলে জানানো হয়েছে। হামলার ধরন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাণ এবং ভবনটির কার্যক্রমে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, রিয়াদের আকাশে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন স্থানে পড়ে। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, এতে দুই নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু আহত হয়েছেন। পাশাপাশি অন্তত ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের শারীরিক অবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর বিস্তারিত বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর পাল্টা অভিযান
এর আগে শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ওই ঘটনার পর বিমান চলাচলও স্থগিত হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের পর সৌদি আরবের ভূখণ্ডে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর জবাবে মঙ্গলবার ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং ধামার ও সাদা প্রদেশে বিমান হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত অবকাঠামো।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, হুতিদের যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে।
বিমান হামলার সময় সানায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় শহরটির বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতেও দেখা গেছে। তবে হামলায় ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদির কঠোর অবস্থান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, সৌদি আরব তার নিরাপত্তা কিংবা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা কোনোভাবেই হুমকির মুখে পড়তে দেবে না।
লোহিত সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। অন্যদিকে, বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়ে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের কারণে অঞ্চলটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করার পর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সীমান্ত সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
ধারান, রিয়াদ ও ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থানে হামলা-পাল্টা হামলার এই ধারাবাহিকতা সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাতকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি স্থাপনা, বেসামরিক আবাসন এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে এর প্রভাব সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও পড়তে পারে।


