স্মরণে-একাত্তরের জননী বীরাঙ্গনা লেখিকা রমা চৌধুরী

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের জীবনকথা থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়, মানুষের হৃদয়ে। কিছু জীবন এতটাই দুঃসহ, এতটাই বেদনাবিধুর অথচ এতটাই সাহসী যে, ব্যক্তিমানুষের গণ্ডি পেরিয়ে তা হয়ে ওঠে একটি জাতির ইতিহাসের অংশ।

রমা চৌধুরী তেমনই এক অসামান্য নারী—একাত্তরের বীরাঙ্গনা, শিক্ষাব্রতী, লেখক এবং অদম্য জীবনসংগ্রামী। তাঁর জীবন ছিল একই সঙ্গে নির্যাতন, সন্তানহারা মায়ের কান্না, নিঃস্বতার সঙ্গে লড়াই এবং আত্মমর্যাদা আঁকড়ে বেঁচে থাকার এক অনন্য আখ্যান।

তাঁকে মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে ‘একাত্তরের জননী’ হিসেবে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

রমা চৌধুরী চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের অন্যতম।

১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একাত্তরের সেই কালরাত্রি

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রমা চৌধুরী ছিলেন তিন শিশুপুত্রের মা। পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়াতেই সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর স্বামী সে সময় ভারতে চলে যান।

১৩ মে ১৯৭১।

সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তাঁর কোলের শিশুসন্তানও তখন তাঁর সঙ্গে ছিল। সম্ভ্রম হারানোর পর আত্মরক্ষার জন্য তিনি পুকুরে গিয়ে লুকিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। হানাদাররা গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়িতে; পুড়ে যায় তাঁর সহায়-সম্বল, সংসার ও জীবনের বহু স্মৃতি।

একজন নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেই থামেনি বর্বরতা—তাঁকে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছিল তাঁর ঘর, সংসার, নিরাপত্তা ও সামাজিক আশ্রয় থেকেও।

এরপর মুক্তিযুদ্ধের বাকি মাসগুলোতে তিন শিশুসন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তাঁকে জলে-জঙ্গলে, পথে-প্রান্তরে লুকিয়ে লুকিয়ে কাটাতে হয়। কখনো পোড়া ভিটায়, কখনো খোলা আকাশের নিচে—এই ছিল তাঁর যুদ্ধকালীন জীবন।

এই ব্যক্তিগত ইতিহাসই পরবর্তীকালে রূপ নেয় তাঁর অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’-তে। বইটি শুধু একজন নারীর আত্মকথা নয়; এটি একাত্তরের নির্মমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত দলিল।

স্বাধীনতা এলো, কিন্তু তাঁর জীবনে এলো না মুক্তি

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু রমা চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনে তখনও শুরু হয়নি মুক্তির দিন।

বিজয়ের প্রাক্কালে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তাঁর সন্তান সাগর। ২০ ডিসেম্বর রাতে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সাগর মারা যায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে সদ্য ফিরে পাওয়া শিশুকে হারানোর সেই শোক ছিল তাঁর জীবনের আরেক গভীর ক্ষত।

এরপর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেক সন্তান টগরও মাত্র তিন বছর বয়সে মারা যায়। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটিও তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

দুই শিশুপুত্রের মৃত্যু যেন একাত্তরের ক্ষতকে আরও গভীর করে দেয়।

এরপরও নিয়তি তাঁকে রেহাই দেয়নি। দ্বিতীয় সংসারের সন্তান দীপঙ্কর টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। একে একে তিন সন্তানকেই হারান তিনি।

খালি পায়ে এক মায়ের পথচলা

রমা চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত প্রতীকগুলোর একটি তাঁর খালি পায়ে হাঁটা।

তিন সন্তানকে তিনি দাহ না করে মাটিতে সমাহিত করেছিলেন। সন্তানদের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন তিনি জুতো পরেননি। বিশেষ করে তৃতীয় সন্তান টুনুর মৃত্যুর পর দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর তিনি খালি পায়ে পথ চলেছেন।

তাঁর কাছে সেই মাটি ছিল সন্তানের মাটি। যে মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে তাঁর তিন সন্তান, সেই মাটির ওপর জুতো পায়ে হাঁটতে তাঁর মন সায় দিত না।

এই খালি পা যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর নীরব প্রতিবাদ, মাতৃত্বের এক অসীম শোক এবং একাত্তরের স্মৃতি বয়ে চলার প্রতীক।

নিঃস্বতার মধ্যেও আত্মমর্যাদা

স্বাধীনতার পর রমা চৌধুরীর জীবন ছিল দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ের নাম।

তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি। সাহায্যের প্রস্তাব এলেও তা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অদ্ভুত আত্মমর্যাদা। নিজের লেখা বই নিজেই বিক্রি করে জীবন ধারণ করতেন। কখনো পত্রিকার সম্মানীর পরিবর্তে বইয়ের কপি পেয়েছেন, পরে সেই বই বিক্রি করেই সংসার চালিয়েছেন। শেষ জীবনে চট্টগ্রামের পথে পথে নিজের লেখা বই ফেরি করে বিক্রি করতে দেখা গেছে তাঁকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা একজন শিক্ষিত, মেধাবী নারী হয়েও তাঁকে জীবিকার জন্য বই হাতে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। কিন্তু সেই দৃশ্য করুণার নয়—বরং আত্মমর্যাদার।

তিনি সাহায্য নিতেন না; নিজের শ্রমের বিনিময়ে বাঁচতে চাইতেন।

লেখক রমা চৌধুরী

রমা চৌধুরীর সাহিত্যকর্মের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, সমাজ, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জীবনবোধ।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’। মুক্তিযুদ্ধের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নির্যাতন, সন্তান হারানোর বেদনা এবং যুদ্ধোত্তর জীবনের অসহনীয় বাস্তবতা এই গ্রন্থকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।

এ ছাড়া তিনি প্রবন্ধ, কবিতা ও উপন্যাসসহ বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে—

*‘একাত্তরের জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’, ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘আগুনরাঙা আগুনঝরা’, ‘অশ্রুভেজা একটি দিন’, ‘স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন-দর্শন’, ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’*সহ আরও বহু গ্রন্থ। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮ বা ১৯ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বীরাঙ্গনা, কিন্তু পরাজিত নন

রমা চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—
নির্যাতন তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি।

যে নারী একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, হারিয়েছেন ঘরবাড়ি ও সম্পদ, যুদ্ধের পর হারিয়েছেন একে একে তিন সন্তান, স্বজনের অবহেলা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েছেন—সেই নারী শেষ পর্যন্ত কলমকে অস্ত্র করে নিয়েছিলেন।

তিনি তাঁর ক্ষতকে লুকাননি। বরং সেই ক্ষতকেই ইতিহাসের সাক্ষ্যে পরিণত করেছেন।

তাঁর লেখা বলেছে—একাত্তর শুধু বিজয়ের গল্প নয়; একাত্তর অসংখ্য মায়ের কান্নার গল্প, অসংখ্য নারীর নির্যাতনের গল্প, সন্তানহারা মানুষের গল্প এবং ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন দেশ গড়ে তোলার গল্প।

শেষ অধ্যায়

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রমা চৌধুরী। জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও একাকিত্বের সঙ্গে লড়াইরত।

তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে তাঁর সন্তান টুনুর সমাধির পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।

মৃত্যুর পরও তাঁর সংগ্রামের স্বীকৃতি এসেছে। তাঁকে মরণোত্তর বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়।

শেষ কথা

রমা চৌধুরী কেবল একজন লেখক নন।
তিনি কেবল একজন বীরাঙ্গনা নন।
তিনি কেবল সন্তানহারা এক জননীও নন।

তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত দলিল।

তাঁর খালি পায়ের পথচলায় ছিল তিন সন্তানের জন্য এক মায়ের অসীম শোক।
তাঁর কলমে ছিল একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাস।
তাঁর নিঃস্ব জীবনে ছিল আত্মমর্যাদার দীপ্তি।
আর তাঁর নীরবতায় ছিল এমন এক আর্তনাদ, যা স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।

রমা চৌধুরী চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ আমাদের কাছে রেখে গেছে এক অমোচনীয় প্রশ্ন—
যে স্বাধীনতার জন্য এত মানুষ জীবন দিলেন, এত মা সন্তান হারালেন, এত নারী নির্যাতিত হলেন, সেই স্বাধীনতার বাংলাদেশ কি আমরা তাঁদের স্বপ্নের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছি?

একাত্তরের এই সাহসী জননীকে গভীর শ্রদ্ধা।

রমা চৌধুরী—আপনি নেই, কিন্তু আপনার খালি পায়ের ছাপ এখনও পড়ে আছে বাংলাদেশের মাটিতে।
আপনার কলমের অক্ষরে, আপনার সন্তানের সমাধির মাটিতে এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে আপনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, একাত্তরের জননী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।