খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই মে ২০২৬, ৭:১৪ এএম
বাংলার নৃত্যাঙ্গনের ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম Bulbul Chowdhury। তিনি ছিলেন একাধারে নৃত্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক, সংগঠক, লেখক এবং আধুনিক নৃত্যনাট্যের পথিকৃৎ। শিল্পকে মানুষের জীবনবোধ, সমাজচেতনা ও মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি উপমহাদেশের নৃত্যধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
প্রকৃত নাম রশীদ আহমদ চৌধুরী। ‘বুলবুল চৌধুরী’ ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার নাম, যে নামে তিনি বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার চুনতি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মোহাম্মদ আজমউল্লাহ ছিলেন বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের ইন্সপেক্টর। শৈশবেই গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি-ফারসি শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে হাওড়া প্রাইমারি স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছোটবেলা থেকেই নাচ, গান, ছবি আঁকা, গল্প ও কবিতা লেখার প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। ১৯৩৪ সালে মানিকগঞ্জ হাইস্কুলে আয়োজিত এক চিত্রপ্রদর্শনীতে তাঁর আঁকা ছবি প্রথম পুরস্কার লাভ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নৃত্যই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা।
মানিকগঞ্জ হাইস্কুলের এক বিচিত্রানুষ্ঠানে স্বরচিত ‘চাতক-নৃত্য’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নৃত্যশিল্পী জীবনের পথচলা। ছাত্রজীবনে প্রেসিডেন্সি কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। এ সময় তাঁর সংস্পর্শে আসেন সরোদবাদক সন্তোষচন্দ্র, সুরশিল্পী তিমিরবরণ ভট্টাচার্য, নৃত্যগুরু উদয়শঙ্কর ও সাধনা বসুর মতো খ্যাতিমান শিল্পীরা। তাঁদের সান্নিধ্য ও প্রেরণা তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও বিকশিত করে।
১৯৩৬ সালে সাধনা বসুর সঙ্গে যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত নৃত্যনাট্য ‘কচ ও দেবযানী’ পরিবেশন ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৩৭ সালে ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন (OFA) প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নৃত্যনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল— নৃত্যের সঙ্গে অভিনয়, অভিব্যক্তি ও বক্তব্যের শক্তিশালী সমন্বয়। তিনি নাচকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজ, ইতিহাস, মানবতা ও সময়ের কথাকে নৃত্যের ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
তাঁর নৃত্যনাট্যের বিষয়বস্তু ছিল বৈচিত্র্যময় এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাসমৃদ্ধ। হিন্দু-মুসলিম পুরাণ, লোককাহিনী, ঐতিহাসিক চরিত্র, সামাজিক সংকট, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সমকালীন বাস্তবতা তাঁর শিল্পে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর নৃত্যের ধারা ছিল অভিব্যক্তিনির্ভর, ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল।
বিষয়বস্তুর নতুনত্ব, কল্পনার গভীরতা এবং মঞ্চ-নির্মাণের নান্দনিকতায় তাঁর নৃত্যনাট্য দেশ-বিদেশে বিপুল প্রশংসা অর্জন করে। ব্যালে নৃত্যের আঙ্গিকে তিনি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক অনুভূতিকে শিল্পরূপ দিয়েছেন।
তাঁর সহধর্মিণী আফরোজা বুলবুলও ছিলেন একজন প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী এবং তাঁর শিল্পযাত্রার বিশ্বস্ত সহচর।
রক্ষণশীল সমাজে নৃত্যকে মর্যাদাপূর্ণ শিল্পরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বুলবুল চৌধুরীর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— নৃত্য কেবল শরীরের ভঙ্গিমা নয়, এটি মানুষের জীবন, অনুভূতি ও সমাজবাস্তবতার এক গভীর শিল্পভাষা।
১৯৪০ সালে তিনি নৃত্যদল নিয়ে ঢাকায় এসে একাধিক নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন এবং দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ১৯৪১ সালের ৩১ মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলকাতা কৃষ্টি কেন্দ্র’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করলেও দেশ বিভাগের পর আবার সক্রিয়ভাবে শিল্পচর্চায় ফিরে আসেন।
১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে নৃত্যানুষ্ঠান করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি নৃত্যদল নিয়ে ইউরোপ সফরে যান এবং ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমাদৃত হন।
১৯৩৪ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৭০টি নৃত্যনাট্য রচনা ও মঞ্চস্থ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নৃত্যনাট্যের মধ্যে রয়েছে— অভিমন্যু, ইন্দ্রসভা, সাপুড়ে, কবি ও বসন্ত, মরুসঙ্গীত, ফসল উৎসব, জীবন ও মৃত্যু, অজন্তা জাগরণ, কালবৈশাখী, হাফিজের স্বপ্ন, ক্ষুধিত পাষাণ, মহাভুভুক্ষা, ভারত ছাড়, আনারকলি, রাসলীলা প্রভৃতি।
দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান পত্রপত্রিকায় তাঁর নৃত্যপ্রদর্শনী সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা প্রকাশিত হয়। ভারতের অমৃতবাজার, স্টেটসম্যান, স্টার অব ইন্ডিয়া, করাচির ডন, লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ, ফ্রান্সের ল্য ফিগারো সহ বহু আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র তাঁর শিল্পকর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।
নৃত্যের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৪২ সালে তিনি ‘প্রাচী’ নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। এছাড়াও তিনি কয়েকটি ছোটগল্প লিখেছিলেন।
মাত্র ৩৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে শিল্পঐতিহ্য নির্মাণ করে গেছেন, তা আজও বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
১৯৫৪ সালের ১৭ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু শিল্পী কখনও সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যান না। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর শিল্পভাবনা এবং নৃত্যভাষা আজও বেঁচে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় “বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা)”— যা আজও বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে চলেছে।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি নৃত্যগুরু বুলবুল চৌধুরীকে।
মন্তব্য