নিতুন কুন্ডু—একটি নাম, অথচ তার ভেতরে যেন একসঙ্গে বাস করত বহু শিল্পের পৃথিবী। তিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ, ভাস্কর, শিল্পোদ্যোক্তা ও সৃজনশীল উদ্ভাবক। ক্যানভাসে রঙের ভাষা থেকে ভাস্কর্যে প্রাণের স্পন্দন, নকশায় সৌন্দর্যবোধ থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন—জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি রেখে গেছেন তাঁর মেধা, মনন ও সৃষ্টিশীলতার অনন্য স্বাক্ষর।
জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৯৩৫, দিনাজপুরে। পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুন্ডু এবং মাতা বীণাপাণি কুন্ডু। শৈশব-কৈশোর থেকেই শিল্পের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ। সিনেমার ব্যানার এঁকে নিজের পড়াশোনার ব্যয় নিজেই বহন করতেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের প্রতিভা ও শ্রমকে পুঁজি করে এগিয়ে যাওয়ার এই আত্মনির্ভরতার গল্প তাঁর সমগ্র জীবনেই যেন এক অনুপ্রেরণার অধ্যায়।
১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ সালে চিত্রশিল্পের পাঁচ বছরের কোর্স সম্পন্ন করেন। চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও পরিণত ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
পরবর্তীতে ঢাকাস্থ মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কখনোই কেবল কর্মজীবনের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেনি।
মুক্তিযুদ্ধের শিল্পী
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অধীনে তিনি তথ্য ও প্রচার বিভাগে ডিজাইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তুলির আঁচড় ও নকশা তখন হয়ে উঠেছিল মুক্তির সংগ্রামের ভাষা। তাঁর আঁকা বিখ্যাত পোস্টারের স্লোগান—
«‘সদাজাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী।’»
একজন শিল্পীর হাতে যখন তুলি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অস্ত্র, তখন শিল্প আর নিছক সৌন্দর্যের বিষয় থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। নিতুন কুন্ডুর শিল্পীজীবনে মুক্তিযুদ্ধ তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; এটি তাঁর দেশপ্রেম ও দায়বদ্ধতারও উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। মানুষের মুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ তাঁর শিল্পভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
শিল্প থেকে শিল্পোদ্যোগ
স্বাধীনতার পর প্রচলিত চাকরিজীবনের নিরাপদ পথ বেছে না নিয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত করেন। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অটবি’। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
অটবির মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি; মানুষের রুচি, নান্দনিকতা ও জীবনযাপনের সৌন্দর্যবোধকে উন্নত করারও চেষ্টা করেছিলেন। শিল্প ও শিল্পোদ্যোগকে একই সূত্রে গেঁথে দেওয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
ক্যানভাসে বহুরূপী শিল্পসাধনা
একজন সৃজনশীল চিত্রশিল্পী হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তাঁর চারটি একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশে-বিদেশে বহু উল্লেখযোগ্য যৌথ প্রদর্শনীতেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক, এচিং, সেরিগ্রাফ, পেনসিল ও কালিকলম—বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি তাঁর শিল্পভাবনাকে প্রকাশ করেছেন। প্রথম জীবনে অবয়বধর্মী চিত্রকলায় আগ্রহী হলেও পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পভাষা ক্রমে বিমূর্ততার দিকে অগ্রসর হয়।
তাঁর ছবিতে তাই শুধু দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ নয়; ছিল অনুভূতির অনুবাদ, চিন্তার বিমূর্ত প্রকাশ এবং রঙ-রেখার নিজস্ব এক নন্দনভাষা।
ভাস্কর্যে ইতিহাস ও জীবনের ভাষা
নিতুন কুন্ডুর প্রতিভা ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাস্কর্যেও তিনি সৃষ্টি করেছেন বহু স্মরণীয় শিল্পকর্ম।
তাঁর উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশিল্পের মধ্যে রয়েছে ‘মা ও শিশু’ (১৯৭৫), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতীক ‘সাম্পান’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনের সড়কদ্বীপের ‘কদমফুল’ ফোয়ারা এবং সোনারগাঁও সড়কদ্বীপের ‘সার্ক ফোয়ারা’। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থাপনাতেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার ছাপ রয়েছে।
বিশেষ করে ‘সাবাস বাংলাদেশ’ তাঁর শিল্পীসত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে একাকার করে দিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্য আজও নতুন প্রজন্মকে সাহস, আত্মত্যাগ ও মুক্তির ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নকশায়ও অনন্য
জাতীয় জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননার ট্রফি, ক্রেস্ট ও মেডেলের নকশাতেও ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর। একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, এশিয়া কাপ ক্রিকেট পুরস্কার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ পুরস্কার, আন্তর্জাতিক শিল্পমেলা ট্রফি, প্রেসিডেন্ট শিশুকিশোর ফুটবল কাপ—এমন বহু সম্মাননার নকশার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
প্যাভিলিয়ন ও তোরণ নির্মাণ, মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা, স্মরণিকার প্রচ্ছদ, পোস্টার, লোগো—সৃজনশীলতার এমন কোনো ক্ষেত্র যেন ছিল না যেখানে তাঁর প্রতিভার বিচরণ ঘটেনি।
শিল্পের সঙ্গে প্রকৌশলের মেলবন্ধন
নিতুন কুন্ডুর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তাশক্তি। একজন শিল্পীর সংবেদনশীলতা যেমন তাঁর মধ্যে ছিল, তেমনি ছিল প্রকৌশলীর বাস্তবধর্মী চিন্তা ও উদ্ভাবনী মন।
মেশিনের যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু, নতুন মেশিনের পরিকল্পনা কিংবা লিফট নির্মাণ—প্রযুক্তি ও শিল্পের এই আপাত ভিন্ন জগতকেও তিনি নিজের সৃজনশীলতার পরিসরে নিয়ে এসেছিলেন।
এ কারণেই নিতুন কুন্ডু শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীলতার এক বিরল কারিগর, যিনি শিল্পকে জীবনের সঙ্গে এবং সৌন্দর্যকে ব্যবহারিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন।
চিত্রশিল্পী ও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার, একুশে পদকসহ দেশি-বিদেশি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
চলে গেছেন, রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি
১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৬—এই দিনে থেমে যায় নিতুন কুন্ডুর জীবনের স্পন্দন। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়। মানুষ চলে যায়, সময় পেরিয়ে যায়, অথচ তার সৃষ্টিরা থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, শহরের প্রাঙ্গণে, ইতিহাসের পাতায় এবং নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়।
আজ তাঁর প্রয়াণদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই শিল্পীকে, যিনি রঙ-তুলি দিয়ে শুধু ছবি আঁকেননি—এঁকেছেন একটি জাতির স্বপ্ন; ভাস্কর্যে শুধু অবয়ব নির্মাণ করেননি—স্থাপন করেছেন ইতিহাসের স্মৃতি; আর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে শুধু ব্যবসা করেননি—বাংলাদেশের মানুষের নান্দনিক জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখেছেন।
নিতুন কুন্ডু ছিলেন শিল্পের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী মানুষ এবং সৃষ্টির প্রতি আজীবন নিবেদিত এক বিরল প্রতিভা।
তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন—
রঙে, রেখায়, ভাস্কর্যে, নকশায়, স্থাপনায় এবং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে।
প্রয়াণদিবসে বহুমাত্রিক এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।



