বাংলা সাহিত্য ও গবেষণার জগতে প্রবোধচন্দ্র সেন এক উজ্জ্বল ও স্মরণীয় নাম। সাহিত্যিক, ছান্দসিক, রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ এবং মননশীল গবেষক হিসেবে তিনি বাংলা ছন্দচর্চাকে একটি সুসংবদ্ধ ও গভীরতর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কবিতার ছন্দকে তিনি শুধু শব্দের বিন্যাস বা মাত্রার হিসাব হিসেবে দেখেননি; এর ভেতরে থাকা সংগীত, গতি, আবেগ ও নান্দনিকতার দিকও তাঁর গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলা ছন্দের ব্যাকরণ, পরিভাষা, বিবর্তন ও ইতিহাস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা বাংলা সাহিত্য-গবেষণায় স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।
প্রবোধচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৭ এপ্রিল কুমিল্লার মনিয়ন্দ গ্রামে। শৈশব থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবনে মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় পাওয়া যায়। কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ অসামান্য ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনের এই সাফল্য পরবর্তী সময়ে তাঁর জ্ঞানসাধনার ভিত আরও শক্ত করে। কর্মজীবনের বড় একটি সময় তিনি অধ্যাপনা ও গবেষণায় কাটিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে তিনি বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনার দায়িত্বও পালন করেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু পেশাগত দায়িত্ব ছিল না; জ্ঞানকে অন্বেষণ করা, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা বিষয়কে যুক্তিনিষ্ঠভাবে বোঝার ক্ষেত্রও ছিল অধ্যাপনা।
তাঁর সাহিত্যসাধনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাংলা ছন্দ। বাংলা কবিতায় ছন্দের ব্যবহার কীভাবে গড়ে উঠেছে, বিভিন্ন কবির রচনায় ছন্দের প্রয়োগ কীভাবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে এবং ছন্দের কাঠামো কীভাবে কবিতার সৌন্দর্য ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে—এসব প্রশ্ন তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে ছিল। বাংলা ছন্দের পরিভাষা ও ব্যাকরণকে সুসংহত করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও অন্যান্য রচনায় ছন্দের বৈচিত্র্য নিয়েও প্রবোধচন্দ্র সেন গভীরভাবে কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ছন্দ’ গ্রন্থ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে তিনি রবীন্দ্র-ছন্দচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রবীন্দ্রকাব্যের ছন্দগত বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা পরবর্তী পাঠক ও গবেষকদের জন্য মূল্যবান হয়ে ওঠে। তাঁর কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—ছন্দকে বিচ্ছিন্ন কোনো কারিগরি বিষয় হিসেবে না দেখে বাংলা কাব্যভাষার সামগ্রিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
বাংলা ছন্দ নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ছন্দ-পরিক্রমা’, ‘ছন্দ-জিজ্ঞাসা’, ‘বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের দান’, ‘বাংলা ছন্দ-চিন্তার ক্রমবিকাশ’ এবং ‘নতুন ছন্দ-পরিক্রমা’। এসব রচনায় বাংলা ছন্দের প্রকৃতি, বিবর্তন, ব্যবহার ও নন্দনতাত্ত্বিক দিক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে বাংলা ছন্দ নিয়ে যাঁরা পাঠ ও গবেষণা করেন, তাঁদের কাছে তাঁর রচনাগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তবে প্রবোধচন্দ্র সেনের মনন শুধু ছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ভারতীয় ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক নিয়েও তিনি লিখেছেন। ‘ধর্মজয়ী অশোক’, ‘রামায়ণ ও ভারত সংস্কৃতি’, ‘ভারত-পথিক রবীন্দ্রনাথ’, ‘ভারতাত্মা কবি কালিদাস’ এবং ‘ভারতবর্ষের জাতীয় সঙ্গীত’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর বিস্তৃত পাঠ, ইতিহাসবোধ ও সংস্কৃতিচিন্তার পরিচয় বহন করে। এসব রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর গবেষণার পরিসর যে কতটা বিস্তৃত ছিল, তারও ধারণা পাওয়া যায়।
তাঁর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে তাঁর জ্ঞানচর্চার একটি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা, নৈতিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের প্রতি তাঁর আস্থা তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্মরণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি মননশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধকে তাঁর জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে রেখেছিলেন।
১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এই বিদগ্ধ সাহিত্যসাধকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারায় ছন্দচর্চার এক নিবেদিত গবেষককে। তবে একজন গবেষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর জীবনের সমাপ্তিতে শেষ হয় না। তাঁর গ্রন্থ, বিশ্লেষণ ও চিন্তার মধ্য দিয়েই সেই উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
বাংলা কবিতার ছন্দকে বোঝার ক্ষেত্রে প্রবোধচন্দ্র সেনের কাজের গুরুত্ব এখানেই। তিনি ছন্দকে কেবল কবিতার কাঠামোগত নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি; বরং এর সঙ্গে ভাষা, সংগীত, অনুভূতি ও কাব্যসৌন্দর্যের সম্পর্ক অনুধাবনের পথ তৈরি করেছেন। তাঁর গবেষণা বাংলা ছন্দচর্চাকে আরও সুসংবদ্ধ ও সমৃদ্ধ করেছে।
আজও বাংলা ছন্দ, রবীন্দ্রসাহিত্য ও সাহিত্য-ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলে প্রবোধচন্দ্র সেনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর জীবন ছিল অধ্যয়ন ও জ্ঞানসাধনার দীর্ঘ পথচলা; তাঁর সাহিত্যকর্ম সেই সাধনারই লিখিত দলিল। বাংলা ছন্দের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য অনুধাবনে তাঁর অবদান তাই বাংলা সাহিত্য-গবেষণার ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধা ও স্মরণে—
সাহিত্যসাধক প্রবোধচন্দ্র সেন।


