স্মরণে শহীদ জায়া বাসন্তী গুহঠাকুরতা

“একজন মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর কর্ম আর তাঁর স্মৃতিরা থেকে যায়—প্রজন্মের পর প্রজন্ম।”

বাংলাদেশের শিক্ষা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে বাসন্তী গুহঠাকুরতা এক উজ্জ্বল, অথচ অনেকটাই নীরব এক অধ্যায়ের নাম। তিনি ছিলেন একজন বিদুষী শিক্ষাবিদ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, লেখক এবং নারীশিক্ষার অন্যতম অগ্রদূত। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ও বেদনাবিধুর পরিচয়—তিনি ছিলেন একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সহধর্মিণী।

১৯২২ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে বাসন্তী গুহঠাকুরতার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই মেধা, মনন ও শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নারায়ণগঞ্জের মর্গান বালিকা বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে বাংলা সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৪৩ সালে বি.টি. পাস করার পর তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে নিজেকে নিবেদন করেন। গেন্ডারিয়া গার্লস হাইস্কুল—পরবর্তীকালে মনিজা রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়—এর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে তিনি প্রায় চার দশক দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কাল ১৯৪৪ থেকে ১৯৮৭/১৯৮৮ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু দেশেই নয়, তাঁর কর্মজীবনের বিস্তার ঘটেছিল বিদেশেও। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি শিক্ষাদানে ডিপ্লোমা অর্জনের পাশাপাশি তিনি লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস সেকেন্ডারি স্কুল ফর গার্লস-এ শিক্ষকতা করেন। শিক্ষার আধুনিক পদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে তিনি নারীশিক্ষার বিকাশে তা কাজে লাগান।

তাঁর জীবন শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সমাজসচেতন ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন—যে প্রতিষ্ঠান যুদ্ধাহত নারী ও পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসনে কাজ করেছিল। তিনি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্যও ছিলেন এবং ১৯৭৫ সালের নারী বর্ষ উপলক্ষে আলমা-আতা সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

তবে বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবনের সবচেয়ে মর্মন্তুদ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে।

সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার নির্মম শিকার হন তাঁর স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। বাসন্তী নিজ চোখে সেই ভয়াবহতার সাক্ষী হন। স্বামীকে হারানোর পরও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং নিজের স্মৃতি, বেদনা ও একাত্তরের নির্মম বাস্তবতাকে ধারণ করে বেঁচে থেকেছেন। তাঁর একমাত্র কন্যা মেঘনা গুহঠাকুরতা পরবর্তীকালে নিজেও একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে পরিচিত হন।

একাত্তরের সেই দুঃসহ স্মৃতি তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিখে রেখে গেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘একাত্তরের স্মৃতি’—যেখানে স্বামীকে হারানোর পর ঢাকায় তাঁর নয় মাসের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতিচিত্র উঠে এসেছে। বইটি ১৯৯২ সালে ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হয় বলে পারিবারিক আর্কাইভে উল্লেখ আছে।

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘কালের ভেলায়’, যেখানে তিনি তাঁর শৈশব ও জীবনের স্মৃতিকে সাহিত্যের আবহে তুলে ধরেছেন। বইটি ১৯৯৪ সালে ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হয়।

নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কাজী মাহবুব উল্লাহ পুরস্কার (১৯৯১)-এ ভূষিত হন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, সমাজসেবা ও সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছ থেকেও স্বীকৃতি লাভ করে।

বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবন তাই কেবল একজন শিক্ষিকার জীবন নয়; এটি এক নারীর অসীম সাহস, আত্মমর্যাদা, শিক্ষা-আদর্শ এবং ব্যক্তিগত শোককে জনমানুষের কল্যাণে রূপান্তরিত করার এক অনন্য কাহিনি।

একদিকে তিনি ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী, অন্যদিকে নিজেই ছিলেন এক আলোকবর্তিকা—যিনি অগণিত মেয়ের হাতে শিক্ষার প্রদীপ তুলে দিয়েছেন। স্বামীকে হারানোর শোক তিনি বহন করেছেন সারাজীবন, কিন্তু সেই শোক তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং তাঁর কলমে, কর্মে ও শিক্ষাদর্শে সেই বেদনা রূপ নিয়েছে দায়িত্ববোধে।

১৯৯৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এই বিদুষী, শিক্ষাব্রতী ও স্মৃতিরক্ষক নারী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি জীবন থেমে গেলেও থেমে যায়নি তাঁর রেখে যাওয়া আলোর পথ।

আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি—

বাসন্তী গুহঠাকুরতাকে—
শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে,
একাত্তরের এক সাহসী সাক্ষী হিসেবে,
শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সহধর্মিণী হিসেবে,
এবং সর্বোপরি একজন মহীয়সী বাঙালি নারী হিসেবে।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—
কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে, আদর্শে ও স্মৃতির ভিতর।
বাসন্তী গুহঠাকুরতা তেমনই এক অনির্বাণ আলোর নাম।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।