“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি,
হাসি হাসি পরব ফাঁসি,
দেখবে ভারতবাসী।”
অগ্নিযুগের সেই দুরন্ত কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু—
যাঁর বুকের ভেতর ছিল স্বাধীনতার আগুন, চোখে ছিল শৃঙ্খলমুক্ত দেশের স্বপ্ন, আর ঠোঁটে ছিল মৃত্যুকে তুচ্ছ করার অদম্য হাসি।
আজ থেকে ১১৮ বছর আগে, ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অপরাধে মুজফ্ফরপুর জেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র প্রায় ১৮ বছর ৮ মাস। এত অল্প বয়সেই তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মাতৃভূমির স্বাধীনতার বেদিতে।
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর সেই উত্তাল সময়ে বঙ্গভঙ্গ, ঔপনিবেশিক নিপীড়ন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে তীব্র প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল, ক্ষুদিরাম ছিলেন তারই এক দীপ্ত প্রতীক। অতি অল্প বয়সে তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সাহসী কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯০৮ সালের মুজফ্ফরপুর বোমা মামলায় প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে ক্ষুদিরাম ব্রিটিশ বিচারক কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপের অভিযানে অংশ নেন। ঘটনাটি দুঃখজনকভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দুইজন ইউরোপীয় নারী নিহত হন। ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন, বিচারের মুখোমুখি হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
কিন্তু মৃত্যুও তাঁর মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারেনি।
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় সেই কিশোর বিপ্লবীর নির্ভীকতা ব্রিটিশ শাসকদেরও বিস্মিত করেছিল। তাঁর আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে ওঠে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়; ভারত সরকারের স্বাধীনতা-সংগ্রাম বিষয়ক উদ্যোগেও তাঁকে তরুণ বীরদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
ক্ষুদিরামের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
বয়স কখনো সাহসের মাপকাঠি নয়,
জীবনের দৈর্ঘ্য নয়—তার মহত্ত্বই মানুষকে অমর করে।
মাত্র আঠারো বছরের এক কিশোর নিজের জীবন দিয়ে যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের মুখে, তার উত্তর ইতিহাস দিয়েছে বহু পরে।
তিনি চলে গেছেন,
কিন্তু তাঁর সেই অমলিন হাসি রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়।
ফাঁসির দড়ি তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করেছে,
কিন্তু স্তব্ধ করতে পারেনি তাঁর স্বপ্নকে।
আজকের প্রজন্মের কাছে ক্ষুদিরাম শুধু একটি নাম নন—
তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস,
স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক,
আর তরুণ হৃদয়ের অদম্য প্রত্যয়ের এক উজ্জ্বল নাম।
হে অগ্নিযুগের অমর বিপ্লবী,
তোমার রক্তে লেখা ইতিহাস আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
তোমার আত্মত্যাগের কাছে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
ক্ষুদিরাম, তুমি মৃত্যুঞ্জয়ী।
তোমার নাম যতদিন স্বাধীনতার ইতিহাস উচ্চারিত হবে,
ততদিন নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে
তুমি জ্বেলে যাবে সাহসের অমর মশাল।
অমর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর প্রয়াণ দিবসে
তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।



