বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হায়দার আকবর খান রনো একটি উজ্জ্বল ও অনন্য নাম। তিনি ছিলেন শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন—ছিলেন জননেতা, তাত্ত্বিক, সংগঠক, লেখক এবং একজন নিরহংকার মানবিক মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে ছিলেন অবিচল, আপসহীন এবং নিষ্ঠাবান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র থাকাকালে তিনি গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকের শুরুতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্র ও গণআন্দোলনের অগ্রসৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল সেই সময়ে তিনি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নেতা হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশেও থেমে থাকেনি তাঁর সংগ্রামী পথচলা। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক ও নেতা। গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধারণ করে তিনি আমৃত্যু রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় থেকেছেন।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) পলিটব্যুরোর সদস্য এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগঠনের আদর্শ ও সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও লেখালেখিতেও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সমাজচিন্তা নিয়ে তাঁর রচিত ও প্রকাশিত তেরোটি গ্রন্থ বাংলা মননশীল সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল যেমন সংগ্রামমুখর, ব্যক্তিজীবন ছিল তেমনি সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর। বিনয়ী, সদালাপী, সদাহাস্যোজ্জ্বল ও নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে তিনি সহকর্মী, অনুসারী এবং সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহ তাঁকে কখনো আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
তাঁর জ্ঞান, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
৩১ আগস্ট ১৯৪২ সালে এক বনেদি ও অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, তাত্ত্বিক ও লেখক ১০ মে ২০২৪ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয় না।
সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে, মুক্তির স্বপ্নে, গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় এবং শোষণমুক্ত সমাজের প্রত্যয়ে হায়দার আকবর খান রনোর মতো মানুষেরা বেঁচে থাকেন অনন্তকাল।
আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই সব্যসাচী মানুষটিকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লাল সালাম, কমরেড রনো।



