বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাঁর বোন হেনা বেগম। ওই বক্তব্যের পর তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত স্বজনদের নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি। গত বুধবার চিতলিয়া গ্রামের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান হেনা। এর আগে তাঁর কয়েকজন নিকটাত্মীয়ও এলাকা ছেড়েছেন। এখন প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা চাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাটি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের। এই গ্রামেই ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর পৈতৃক বাড়ি। বাড়ির পাশেই বসবাস করতেন তাঁর বোন হেনা বেগম। মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর জামাতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গত ২৪ অক্টোবর সকালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ পিরোজপুরে নিয়ে আসা হলে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর মরদেহ সেখানে দাফন না করার দাবি জানান। এ সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় স্বজনেরা উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। তবে দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। তাঁদের অভিযোগ, দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলার পর থেকেই হেনা বেগমের ওপর চাপ ও হুমকি বাড়তে থাকে।
মোবাইল ফোনে হেনা বেগম বলেন, রাতে ঝুপড়িঘরে থাকতেও তিনি ভয় পাচ্ছেন। ভাইয়ের দাফনে যারা বাধা দিয়েছিল, বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার পর তাঁকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে বাড়িতে থাকা নিরাপদ মনে না করায় স্বজনদের সঙ্গে এলাকা ছেড়েছেন। প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাইবেন বলেও জানান তিনি।
মানিক পশারীর পরিবারের অন্য সদস্যরাও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাই পান্না পশারী খুলনার বটিয়াঘাটায় বসবাস করেন। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে পিরোজপুরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গেলে তাঁকে হুমকি দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পান্নার ভাষ্য, ভাইয়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে পিরোজপুরে এসেও হুমকির মুখে তাঁদের ফিরে যেতে হয়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী। চিতলিয়া গ্রামটি পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। জিয়ানগর উপজেলা জামায়াতের আমির আলী হোসেন বলেন, তাঁদের দলের পক্ষ থেকে মানিক পশারীর কোনো স্বজনকে হুমকি দেওয়া হয়নি কিংবা হয়রানিও করা হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনের পর এলাকায় আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে পরিস্থিতির ওপর পুলিশ নজর রাখছে। গ্রাম পুলিশও নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কথা বলা হলেও মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার পর তাঁর স্বজনদের এলাকা ছাড়তে হওয়া উদ্বেগজনক। হেনা বেগমের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া, হুমকির উৎস শনাক্ত করা এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানিক পশারীর বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার ইতিহাস ঘিরে দাফনের সময় যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে একদিকে যেমন পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।


