১০ মিটার হাঁটাও ছিল কঠিন, সেই খাজার ১৬ টেস্ট সেঞ্চুরি

ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষের গতিময় বোলিং, স্পিনের ঘূর্ণি কিংবা নিজের অফ ফর্ম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি ব্যাটসম্যান উসমান খাজার লড়াইটা ছিল আরও কঠিন। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল এমন এক রোগ, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ শরীরকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে। একসময় এই রোগের কারণে ১০ মিটার হাঁটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্য। অথচ সেই খাজাই টেস্ট ক্রিকেটে করেছেন ১৬টি সেঞ্চুরি, সংগ্রহ করেছেন ৬ হাজার ২২৯ রান এবং খেলেছেন ৮৮টি ম্যাচ।

ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে তাঁর সাফল্যের হিসাব পাওয়া গেলেও দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিল এই অসাধারণ যাত্রার পেছনের যন্ত্রণার গল্প। মাত্র ২২ বছর বয়সে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন খাজা। প্রায় ১৭ বছর ধরে সেই অসুস্থতার কথা গোপন রেখেছিলেন তিনি। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অস্ট্রেলিয়ান স্টোরি’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জীবনের কঠিন সেই অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেছেন সাবেক এই অস্ট্রেলীয় ওপেনার।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত নিজের সুস্থ টিস্যুতে আক্রমণ করে। বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ, ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে দৈনন্দিন চলাফেরাসহ স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। খাজার ক্ষেত্রেও রোগটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। তাঁর বাঁ হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হতো, এমনকি অল্প দূরত্ব হাঁটার ক্ষমতাও হারাতে বসেছিলেন তিনি।

সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে খাজা বলেছেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, মারা যাব।’

যে তরুণ ক্রিকেটার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাটিং করতেন, মাঠে দৌড়াতেন এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন, তাঁর জীবনেই নেমে এসেছিল এমন এক সংকট। ক্রিকেট ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার আগেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল ভবিষ্যৎ। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারার বিষয়টিই তখন তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৯ সালে শুরু কঠিন লড়াই

সময়টা ২০০৯ সাল। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে খেলছিলেন খাজা। মৌসুমের বিরতিতে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময়ই ধরা পড়ে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে দেখা দেয় গভীর অনিশ্চয়তা।

চিকিৎসকেরা তাঁর রোগ সম্পর্কে জানতেন। ক্রিকেট প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিষয়টি অবগত ছিলেন। কিন্তু সতীর্থদের কাছে অসুস্থতার কথা প্রকাশ করতে চাননি খাজা। তাঁর আশঙ্কা ছিল, রোগের কথা জানাজানি হলে দলের অন্যরা তাঁকে ভিন্নভাবে দেখতে পারেন। কেউ হয়তো বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, আবার প্রতিপক্ষও তাঁর শারীরিক দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে।

এই আশঙ্কা থেকেই দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন তিনি। এমনকি ডেভিড ওয়ার্নার ও মাইকেল হাসির মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সাবেক সতীর্থদের কাছেও বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। একই ড্রেসিংরুমে সময় কাটানো, একসঙ্গে অনুশীলন করা কিংবা মাঠে লড়াই করার পরও তাঁর শরীরের ভেতরে চলতে থাকা কঠিন সংগ্রামের কথা জানতে পারেননি তাঁরা।

খাজার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল পেশাদার ক্রিকেটে নিজের অবস্থান ধরে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি চাইতেন, মাঠে তাঁর পরিচয় নির্ধারিত হোক পারফরম্যান্স দিয়ে, অসুস্থতা দিয়ে নয়।

ওষুধ ও ইনজেকশনেই ফিরেছিল ক্রিকেটে ফেরার আশা

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু মানসিক দৃঢ়তা যথেষ্ট ছিল না। নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। চিকিৎসার সহায়তায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ তৈরি হয়। রোগ শনাক্ত হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরতে সক্ষম হন খাজা।

চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ওই ওষুধ না থাকলে আমি আর কোনো দিন ক্রিকেট খেলতে পারতাম না। এমনকি স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারতাম না।’

তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ক্রিকেটে ফেরাটা কতটা কঠিন ছিল। একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের জন্য শারীরিক সক্ষমতা, নিয়মিত অনুশীলন এবং দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার সামর্থ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সেখানে এমন একটি রোগ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে টিকে থাকা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

চিকিৎসা নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে এগোলেও খাজার ক্যারিয়ার মসৃণ ছিল না। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর। জাতীয় দলের হয়ে খেলার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলেও পরবর্তী সময়ে বারবার দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনাও শুনতে হয়েছে। তবে প্রতিটি বাধা পেরিয়ে আবার ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন তিনি।

অ্যাশেজে প্রত্যাবর্তন, সিডনিতেই বিদায়

খাজার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ২০২১-২২ মৌসুমের অ্যাশেজ সিরিজ। সিডনি টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন তিনি। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, উত্থান-পতন এবং দল থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতার পর এই পারফরম্যান্স ছিল তাঁর সামর্থ্যের বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াইয়ে আবারও শক্তভাবে ফিরে আসেন তিনি।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ব্যাটিং লাইনআপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, পরিস্থিতি বুঝে খেলার দক্ষতা এবং চাপ সামলে ইনিংস গড়ে তোলার ক্ষমতা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৮৮টি টেস্ট খেলে ৬ হাজার ২২৯ রান ও ১৬টি সেঞ্চুরি অর্জন করেন তিনি।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজের পঞ্চম টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান খাজা। যে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একসময় টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তাঁর, সেই মাঠেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লেখা হয়।

তবে তাঁর ক্রিকেটজীবনের পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে আরেকটি গল্প। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া, অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসবের সঙ্গে লড়াই করেই তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

‘সবর’ আত্মজীবনীতে উঠে আসবে অজানা অধ্যায়

অবসরের পর নিজের জীবনের গোপন অধ্যায় প্রকাশ্যে এনে খাজা শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন না, বরং দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও সামনে আনছেন। তাঁর আত্মজীবনীর নাম ‘সবর’। আরবি এই শব্দের অর্থ ধৈর্য। খাজার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকা এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে নামটির তাৎপর্য গভীরভাবে মিলে যায়।

আত্মজীবনীতে নিজের জীবন ও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের আরও অনেক অজানা ঘটনা তুলে ধরার কথা রয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা অসুস্থতার অভিজ্ঞতা এখন অন্যদের সাহস জোগানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করতে চান তিনি।

বিশেষ করে অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে খাজার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি রোগ মানেই যে জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, তাঁর নিজের ক্যারিয়ার তার একটি উদাহরণ। অবশ্য এ ধরনের রোগের অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসার ফল ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার পাশাপাশি নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে সচেতন থাকাও জরুরি।

খাজা বলেছেন, ‘রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নিয়েও যদি কেউ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারে, তাহলে আমার মনে হয়, আরও অনেক মানুষও অনেক কিছু অর্জন করতে পারবে।’

তাঁর এই বক্তব্য কেবল ক্রীড়াবিদদের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা যেকোনো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। কারণ, রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অনেকেই নিজের সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। খাজার অভিজ্ঞতা দেখায়, উপযুক্ত চিকিৎসা, নিজের প্রতি আস্থা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানকে বিচার করা হয় রান, সেঞ্চুরি, গড় কিংবা দলের জয়ে তাঁর অবদানের ভিত্তিতে। উসমান খাজার নামের পাশে ১৬টি টেস্ট সেঞ্চুরি এবং ৬ হাজার ২২৯ রান চিরকাল লেখা থাকবে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের পেছনে যে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং ক্যারিয়ার হারানোর ভয় ছিল, তা এত দিন অনেকের অজানাই রয়ে গেছে।

২২ বছর বয়সে যখন ১০ মিটার হাঁটাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এতটা সাফল্য অর্জন করবেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ ছিল না। সেই অনিশ্চয়তা পেরিয়ে তিনি শুধু ক্রিকেটে ফিরেই আসেননি, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পরিচিত টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে।

তাঁর ১৬টি সেঞ্চুরি ক্রিকেটের ইতিহাসে পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় জয়টি হয়তো কোনো স্কোরবোর্ডে ধরা পড়বে না। সেটি ছিল নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাওয়া, ক্রিকেটে ফেরার স্বপ্ন আঁকড়ে থাকা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া।

উসমান খাজার সেই লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ ছিল অদৃশ্য, কিন্তু তাঁর অর্জন দৃশ্যমান। আর সেই অর্জনের পেছনের গল্পই তাঁকে শুধু একজন সফল ক্রিকেটার নয়, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে চলা একজন মানুষ হিসেবেও আলাদা করে তুলে ধরে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।