গ্রাহকের কয়েকশত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার ১২৪টি মামলার পরোয়ানাভুক্ত এবং ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মো. আনিছুর রহমানকে (৪৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা-পুলিশের একটি বিশেষ দল তাকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আটক আনিছুর রহমান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সদরপুর গ্রামের অধিবাসী। ২০০৬ সালে তিনি কুমারখালীর আলাউদ্দিননগর এলাকায় ‘বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের’ আওতায় ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি ভুঁইফোড় সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কার্যক্রম শুরু করার পর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা ও ঝিনাইদহসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি শাখা বিস্তার করেন আনিছুর। এসব শাখায় সাধারণ মানুষকে ‘মেয়াদ শেষে আমানতের দ্বিগুণ টাকা ফেরতের’ চটকদার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আমানত হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।
পরবর্তীতে গ্রাহকদের লগ্নিকৃত প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আনিছুর দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে জমি, বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়িসহ বিপুল সম্পত্তির পাহাড় গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা আসল টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে ওই বছরের নভেম্বরে সব কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হন তিনি।
আদালত ও পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতারণার শিকার গ্রাহকেরা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে ১২৪টি মামলা দায়ের করেন। আদালত এসব মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন এবং ১২টি মামলায় সাজা ঘোষণা করেন। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় আনিছুরকে প্রথমবার গ্রেফতার করে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট দেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আরও ১০৪ জন আসামির সাথে তিনি কৌশলে পালিয়ে যান।
কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহাগ শিকদার জানান, কারাগার থেকে পালিয়ে গ্রেফতার এড়াতে আনিছুর নিজে কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নারায়ণগঞ্জ, রাজধানীর শাহবাগ ও উত্তরা এলাকায় আত্মীয়দের বাসায় ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরায় ছেলের বাসায় তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
আনিছুরের গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমারখালী থানা চত্বরে শত শত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক ও সঞ্চয়কারী ভিড় জমান। নিজেদের ভিটেমাটি ও সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে দিশেহারা অনেক বয়োবৃদ্ধ ভুক্তভোগীকে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। পাংশা থেকে আসা আবদুল মাজেদ জানান, পোশাক কারখানার জীবনের সমস্ত সঞ্চিত সাড়ে ১১ লাখ টাকা আমানত রেখে এখন তিনি নিঃস্ব। একইভাবে নিজের জমানো ৩০ লাখ টাকা হারিয়ে সুবিচারের দাবি জানিয়েছেন জাহানারা খাতুন নামের এক মাঠকর্মী।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই চিহ্নিত প্রতারককে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের পাওনা টাকা উদ্ধারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


