২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড: তাহলে প্রকৃত হামলাকারী কারা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রক্তাক্ত অধ্যায়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমান। আহত হন কয়েক শত মানুষ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও হামলার লক্ষ্য যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব ছিল, সে বিষয়ে তখন থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি তদন্ত ও বিচারিক নথিতেও আলোচনা হয়েছে।

কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক ইতিহাস এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ২০১৮ সালে দণ্ডিত ৪৯ জনই শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সবাইকে খালাস দেন। রাষ্ট্র সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও খালাস বহাল রাখেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট যে নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল, আপিল বিভাগ সেই পর্যবেক্ষণও বাতিল করে দেন।

ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, ২১ আগস্টের হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা তাহলে কারা? এবং এত বছর পরও কেন সেই প্রশ্নের একটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া গেল না?

প্রথম তদন্তেই কেন উঠেছিল ‘জজ মিয়া’?

হামলার পরপরই তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। পরে তদন্তের একটি পর্যায়ে নোয়াখালীর যুবক জালাল আহমেদ, যিনি ‘জজ মিয়া’ নামে পরিচিত, গ্রেপ্তার হন। তাকে হামলার সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করে একটি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমে সেই বয়ান প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং জজ মিয়া মামলার প্রকৃত হামলাকারী নন বলে স্পষ্ট হয়ে যায়।

জজ মিয়াকে ঘিরে তৈরি হওয়া বয়ান পরে বাংলাদেশের বিচার ও তদন্তব্যবস্থার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের রায়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়া এবং হামলাকারীদের সহযোগিতার অভিযোগে কয়েকজন সাবেক পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকেও সাজা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ পরবর্তী তদন্তেই প্রমাণিত হয়েছিল যে প্রাথমিক তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভ্রান্তিকর।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জজ মিয়া ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হওয়া আর প্রকৃত হামলাকারী শনাক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি প্রতিষ্ঠিত হলেও দ্বিতীয় প্রশ্নটি এখনো আইনি অর্থে অমীমাংসিত।

২০০৭-০৮ সালে তদন্তের মোড় বদল

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলাটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডি ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয়। সেই অভিযোগপত্রে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের নামও ছিল।

এই পর্যায়ে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে একটি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। মুফতি আবদুল হান্নানের জবানবন্দিতে হামলার পরিকল্পনা, গ্রেনেড সরবরাহ এবং হামলায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে মামলাটির অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। ২০১১ সালে দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। ফলে মামলার তদন্তের পরিধি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

তারেক রহমান ও বাবরকে কেন আসামি করা হয়েছিল?

অধিকতর তদন্তের পর অভিযোগের কাঠামো ছিল মূলত তিন স্তরের।

প্রথম স্তরে ছিল হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া জঙ্গি সদস্যরা। দ্বিতীয় স্তরে ছিল হামলার পরিকল্পনা ও সহায়তার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তৃতীয় স্তরে ছিল হামলার পর তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়া, হামলাকারীদের আশ্রয়-সহায়তা দেওয়া এবং তদন্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে কিছু সরকারি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভূমিকা।

এই তদন্তের ভিত্তিতেই তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১২ সালে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ে বাবর ও সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হামলার পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, সহযোগিতা এবং তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগে এই সাজা দেওয়া হয়েছিল।

সেই রায়ে ২১ আগস্টের ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

কিন্তু এই রায়ই শেষ পর্যন্ত টেকেনি।

২০২৪ সালের হাইকোর্ট কেন সব দণ্ড বাতিল করল?

২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলার বিচারিক আদালতের পুরো রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন। আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মামলার অধিকতর তদন্তের আইনগত ভিত্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণের মান এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হামলার সময় কে গ্রেনেড ছুড়েছে, কে গ্রেনেড সরবরাহ করেছে বা প্রত্যেক অভিযুক্ত কীভাবে হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে গুরুতর ঘাটতি ছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগপত্রেও গ্রেনেডের সরবরাহকারী সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকার বিষয়টি আদালতে উঠে আসে।

আরও বড় বিষয় ছিল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি।

হাইকোর্টে আসামিপক্ষ দাবি করে, কয়েকটি স্বীকারোক্তি নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল। আদালত এসব বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করে। মুফতি আবদুল হান্নানের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিও পরে প্রত্যাহার করা হয়েছিল বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগও স্পষ্ট করে যে এসব ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তির স্বেচ্ছাস্বীকৃতির বিষয়ে গুরুতর সন্দেহ ছিল এবং সেগুলো আইনগতভাবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, হান্নানকে তার ৩৪২ ধারার জিজ্ঞাসাবাদের আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় প্রসিকিউশনের মামলাতেও একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

তাহলে কি ২০১৮ সালের রায় পুরোপুরি ভুল?

এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে জটিল।

২০১৮ সালের বিচারিক আদালত যে বয়ানের ওপর ভিত্তি করে দণ্ড দিয়েছিল, ২০২৪ সালের হাইকোর্ট সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে আইনগতভাবে টেকসই মনে করেননি। এরপর ২০২৫ সালে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

এর অর্থ এই নয় যে আদালত বলেছে, ‘২১ আগস্টের কোনো ষড়যন্ত্র বা হামলা ঘটেনি।’ হামলা, মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বিতর্ক হলো, এই অপরাধের সঙ্গে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সেই প্রমাণ দিয়ে তার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার ভুক্তভোগী আছে, প্রত্যক্ষদর্শী ও আলামত আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না থাকলে আদালত তাকে দণ্ড দিতে পারে না। ২০২৪-২৫ সালের বিচারিক ফলাফল মূলত এই জায়গাতেই দাঁড়িয়েছে।

তাহলে ‘প্রকৃত অপরাধী’ কারা?

বর্তমান আইনি অবস্থায় এর সরাসরি উত্তর হলো: আদালত কাউকে প্রকৃত অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেনি।

২০১৮ সালের রায়ে যাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তাদের কেউই এখন ২১ আগস্ট মামলায় দণ্ডিত নন। আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাদের খালাস বহাল রেখেছে। ফলে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর বা অন্য কোনো সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে এখন আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে ‘২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অপরাধী’ বলা আইনগতভাবে সঠিক হবে না।

একইভাবে, শুধু মুফতি আবদুল হান্নানের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে হুজি-বিকে পুরো হামলার চূড়ান্ত দায়ী বলাও বর্তমান বিচারিক অবস্থায় যথেষ্ট নয়।

তবে তদন্তের ইতিহাসে হুজি-বির সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ২০০৭-০৮ সালের তদন্তে মুফতি হান্নানসহ জঙ্গিদের নাম উঠে আসে এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

অর্থাৎ ‘কেউ জানে না’ এবং ‘আদালতে প্রমাণিত হয়নি’ এই দুটি কথাও এক নয়। তদন্তে একাধিক বয়ান, সন্দেহ ও অভিযোগ সামনে এসেছিল; কিন্তু সেগুলোর কোনটি সত্য এবং কোনটি আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণে পরিণত হতে পারে, সেটিই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোথায়?

২১ আগস্টের ঘটনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু একটি মামলার রায় বাতিল হওয়া নয়। সমস্যা হলো, প্রায় দুই দশকের তদন্ত ও বিচার শেষে ঘটনাটির একটি নির্ভরযোগ্য, স্বাধীন ও পুনরুত্পাদনযোগ্য তদন্তভিত্তিক সত্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

প্রথম পর্যায়ের তদন্ত ‘জজ মিয়া’ বয়ান তৈরি করে প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরবর্তী তদন্ত সেই বয়ানকে ভেঙে নতুন রাজনৈতিক ও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বয়ান সামনে আনে। এরপর সেই তদন্তের ভিত্তিতে দণ্ড হয়। আবার উচ্চ আদালতে সেই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

ফলে একই ঘটনার তিনটি আলাদা স্তর দেখা যায়:

প্রথম স্তর: প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত না করে জজ মিয়াকে কেন্দ্র করে তদন্ত।

দ্বিতীয় স্তর: নতুন তদন্তে হুজি-বি সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং ২০১৮ সালের দণ্ড।

তৃতীয় স্তর: হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে সেই দণ্ড বাতিল এবং সব আসামির খালাস।

এই ধারাবাহিকতা দেখায়, তদন্ত ও বিচার দুটোই দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকা আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী ছিলেন তা প্রমাণ করা এক বিষয় নয়।

নতুন করে তদন্তের দরজা কি পুরোপুরি বন্ধ?

এখানেও ২০২৫ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ।

হাইকোর্ট ২০২৪ সালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেছিল, ন্যায়বিচারের স্বার্থে ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত ও বিশেষজ্ঞ সংস্থাকে দিয়ে নতুন তদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলেছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ এই পর্যবেক্ষণ বাদ দেয়। আদালতের যুক্তি ছিল, ওই পর্যবেক্ষণ নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বিচারিক হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পড়ে এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে কোনো তদন্তই আইনগতভাবে অসম্ভব। সাম্প্রতিক আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের রায় নতুন তদন্তের ওপর সরাসরি আইনগত নিষেধাজ্ঞা তৈরি করেনি। তবে নতুন তদন্ত করতে হলে তার নিজস্ব আইনগত ভিত্তি, এখতিয়ার ও প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থাৎ এখন প্রশ্নটি আদালতের পুরোনো মামলাকে পুনরায় একইভাবে চালু করার চেয়ে বড়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এমন একটি স্বাধীন তদন্ত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যা আগের দুই দফা তদন্তের বাইরে গিয়ে নতুন করে প্রমাণ সংগ্রহ, ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্য যাচাই এবং হামলার অর্থায়ন ও পরিকল্পনার উৎস অনুসন্ধান করবে?

কী কী প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই?

২১ আগস্টের ঘটনাকে সত্যিকার অর্থে পুনরায় তদন্ত করতে হলে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

এক. হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো কোথা থেকে এসেছিল?

দুই. কারা গ্রেনেড সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণ করেছিল?

তিন. হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিচয় কী?

চার. হামলার আগে কারা পরিকল্পনা বা বৈঠকে যুক্ত ছিল?

পাঁচ. হামলার দিন নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

ছয়. হামলার পর কারা তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং তার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

সাত. জজ মিয়ার মতো একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কেন তদন্তের কেন্দ্রে আনা হয়েছিল?

আট. প্রথম তদন্তে যে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল, তার কী হয়েছিল?

নয়. ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১১ সালের তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলোর মধ্যে কোনগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়?

দশ. ২০১৮ সালের দণ্ডের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তির বাইরে আর কোনো স্বাধীন ফরেনসিক বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল কি না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ‘প্রকৃত অপরাধী’ নির্ধারণ করা কঠিন।

তাহলে কেন বিচার হচ্ছে না?

প্রথম কারণ, বর্তমানে কোনো দণ্ড বহাল নেই। ২০২৪ সালের হাইকোর্টের খালাস এবং ২০২৫ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর ২১ আগস্ট মামলায় কোনো আসামি দণ্ডিত অবস্থায় নেই।

দ্বিতীয় কারণ, পুরোনো তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। জজ মিয়া পর্ব যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি পরবর্তী তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তিগুলোর নির্ভরযোগ্যতাও আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তৃতীয় কারণ, হাইকোর্টের নতুন তদন্তের পর্যবেক্ষণও আপিল বিভাগ বাতিল করেছে। ফলে ২০২৪ সালের রায়ের পর যে সরাসরি নতুন তদন্তের একটি বিচারিক পথ তৈরি হয়েছিল, সেটি আর নেই।

চতুর্থ কারণ, ঘটনার ২২ বছর পর প্রমাণ সংগ্রহের বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য আলামত নষ্ট বা হারিয়ে যেতে পারে, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি দুর্বল হতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ মারা গেছেন, কেউ বিদেশে আছেন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অনেকেই অবসর নিয়েছেন।

সবশেষে রয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্ন। ২১ আগস্টের বিচার দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে দায়ী করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে।

শেষ কথা: হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হয়নি, শেষ হয়েছে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া

২১ আগস্টের মামলার বর্তমান অবস্থাকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায় এভাবে: একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার জন্য একসময় বহু মানুষ দণ্ডিতও হয়েছিল; কিন্তু সেই দণ্ড শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে টেকেনি।

জজ মিয়া প্রকৃত হামলাকারী ছিলেন না, সেটি পরবর্তী তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে। আবার ২০১৮ সালের রায়ে যাদের প্রকৃত অপরাধী হিসেবে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেও সেই দণ্ড এখন আর কার্যকর নেই। আপিল বিভাগ তাদের খালাস বহাল রেখেছে।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাসুলভ প্রশ্নটি ‘তারেক রহমানই কি হামলা করেছিলেন?’ কিংবা ‘হুজি-বিই কি হামলা করেছিল?’ এমনভাবে প্রশ্নটি স্থির করে দেওয়া নয়।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যারা গ্রেনেড ছুড়েছিল, যারা তাদের অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়েছিল, যারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল এবং যারা পরে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রত্যেককে কি কখনো স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল?

বর্তমান বিচারিক রেকর্ডের উত্তর হলো: না, চূড়ান্তভাবে হয়নি।

এ কারণেই ২২ বছর পরও ২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো হামলার ঘটনা নয়, বরং হামলার সত্যিকারের দায় কার, সেটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে রাষ্ট্র এখনো প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

আর এখানেই এই মামলার সবচেয়ে বড় বিচারিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রশ্নটি থেকে যায়।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।