খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৬:৪০ পিএম
মৌসুমি বায়ু ও সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের যৌথ প্রভাবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত কয়েকদিন ধরে শুরু হওয়া অবিরাম ভারী বর্ষণ এখন এক দুর্যোগপূর্ণ রূপ নিয়েছে। এই অতিবৃষ্টির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তা গত ৪৩ বছরের বৃষ্টিপাতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আকাশভাঙা এই বৃষ্টির কারণে পুরো নগরী জুড়ে এক ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার এই চরম সংকটের মাঝেই দেয়াল ধসে একজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, তীব্র বৃষ্টির তোড়ে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচল। বৈরী আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম নগরীতে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা এই ঐতিহাসিক রেকরডের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট বন্দরনগরীতে সর্বোচ্চ ৪১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেই হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত বিগত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আরেকটি সাধারণ বুলেটিনে জানানো হয়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৯৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। সাগরে নিম্নচাপের সক্রিয়তার কারণে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেয়ে হালকা বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি রাখা হয়েছে।
টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানির যুগপৎ প্রভাবে নগরীর চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান নোংরা পানি জমে গেছে। রাস্তায় গণপরিবহন না পেয়ে অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ পথচারীদের মাইলের পর মাইল হেঁটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে নেওয়া প্রায় ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তব কার্যকারিতা ও সুফল নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকায় একটি সীমানা দেয়াল ধসে শফিকুল রহমান নামের এক স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীর করুণ মৃত্যু হয়েছে। ওই একই দুর্ঘটনায় তার পরিবারের আরও তিন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা পরিবারগুলোকে রক্ষায় জোর তৎপরতা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা ২৬টি পাহাড়ের ঢাল থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করার পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। চসিকের ১০১ সদস্যের ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ও যেকোনো জরুরি উদ্ধারকাজে মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
যোগাযোগ ও অর্থনীতিতেও এই দুর্যোগের বড় ধাক্কা লেগেছে। পাহাড়ি ঢলে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে এই রুটে চলাচলকারী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ও ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’ ট্রেনের প্রায় এক হাজার যাত্রী বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে, সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করা ৪৩টি মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় স্থবিরতা তৈরি করেছে। আকাশপথের শিডিউলেও বড় বিপর্যয় ঘটেছে; শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অবতরণ করতে না পেরে দুটি আন্তর্জাতিক ও একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটকে ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটার কোনো লক্ষণ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য