৯ মাসে সিটি ব্যাংকের মুনাফা ৮৬৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ২০%

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ৮৬৭ কোটি টাকা নিটমুনাফা করেছে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক সিটি ব্যাংক পিএলসি। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফার পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশের বেশি।

ব্যাংকটির আয় বৃদ্ধির পেছনে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে পাওয়া আয়, ঋণের সুদ আয় এবং আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয়ের তুলনামূলক কম বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে আমানত ও ঋণের পরিমাণ বাড়ায় ব্যাংকটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকের আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করা হয়। ওই প্রতিবেদনেই ৮৬৭ কোটি টাকা মুনাফার তথ্য উঠে আসে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আগামী রোববার দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের পুরো বছরে সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংকটির মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বছরের বাকি তিন মাসে আয় ও মুনাফার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে বার্ষিক আর্থিক ফলাফলে আরও ইতিবাচক চিত্র দেখা যেতে পারে।

ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে আয় ৩ হাজার কোটি টাকা

সিটি ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ খাত থেকে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ৩ হাজার ২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে ব্যাংকটির আয় বেড়েছে ২২৭ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বেশি।

ব্যাংকগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড। এসব আর্থিক উপকরণে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা সুদ পেয়ে থাকে। বিশেষ করে ঋণ বিতরণের পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ব্যাংকের আয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এ খাতের আয় বৃদ্ধির প্রভাব সামগ্রিক মুনাফায় প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রকৃত সুদ আয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয়েও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সিটি ব্যাংকের প্রকৃত সুদ আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১৬৯ কোটি টাকা।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রকৃত সুদ আয় বেড়েছে ১৫৫ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রকৃত সুদ আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এই আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ আয় বেড়ে যাওয়া। চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ঋণের সুদ থেকে ব্যাংকটি আয় করেছে ৪ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৪ হাজার ২৬ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ঋণের সুদ আয় বেড়েছে ২২৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যাংকটির ব্যয় বেড়েছে তুলনামূলক কম। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আমানতের বিপরীতে সুদ হিসেবে ব্যাংকটি পরিশোধ করেছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে ৭৪ কোটি টাকা।

এখানে ঋণের সুদ আয় ও আমানতের সুদ ব্যয়ের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ থেকে আয় যেখানে ২২৯ কোটি টাকা বেড়েছে, সেখানে আমানতের সুদ ব্যয় বেড়েছে ৭৪ কোটি টাকা। দুই খাতের এই পার্থক্য ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

আমানত ও ঋণের পরিমাণেও বড় প্রবৃদ্ধি

মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি সিটি ব্যাংকের আমানত, ঋণ ও মোট সম্পদের পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির সমন্বিত মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ৭২০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ মাত্র নয় মাসে ব্যাংকটির মোট সম্পদ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ২২ দশমিক ৮ শতাংশ।

আমানতের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সিটি ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৬৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। ফলে নয় মাসে আমানত বেড়েছে ১৪ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণও বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণ ও অগ্রিম ছিল ৫০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এ সময়ে ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির সম্পদ, আমানত ও ঋণের এই প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। তবে ঋণ ও আমানত বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান, খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততার বিষয়গুলোও ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য বেড়েছে

সিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার আরেকটি ইতিবাচক সূচক হলো শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য বা নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি)। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য ছিল ৩৫ টাকা ৩৭ পয়সা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ টাকা ৫১ পয়সা।

অর্থাৎ নয় মাসে শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য বেড়েছে ৬ টাকা ১৪ পয়সা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ও শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন সম্পদের হিসাব বুঝতে সহায়তা করে। তবে শুধু এই সূচকের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের বিনিয়োগমূল্য নির্ধারণ করা যায় না। আয়, মুনাফা, সম্পদের গুণগত মান, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বাজারমূল্যও বিবেচনায় নিতে হয়।

সিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার তুলনামূলক চিত্র

আর্থিক সূচক ২০২৫ সালের শেষ/প্রথম ৯ মাস ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর/প্রথম ৯ মাস
প্রথম ৯ মাসের মুনাফা ৭২২ কোটি টাকা ৮৬৭ কোটি টাকা
সরকারি বিল-বন্ড থেকে আয় ২,৭৭৫ কোটি টাকা ৩,০০২ কোটি টাকা
প্রকৃত সুদ আয় ১৬৯ কোটি টাকা ৩২৪ কোটি টাকা
ঋণের সুদ আয় ৪,০২৬ কোটি টাকা ৪,২৫৫ কোটি টাকা
আমানতের সুদ ব্যয় ৩,৮৫৭ কোটি টাকা ৩,৯৩১ কোটি টাকা
মোট সম্পদ ৮৪,৭২০ কোটি টাকা ১,০৪,০০৮ কোটি টাকা
মোট আমানত ৬৩,১৭০ কোটি টাকা ৭৭,৪০৪ কোটি টাকা
মোট ঋণ ও অগ্রিম ৫০,৬১৬ কোটি টাকা ৫৪,৫৮৫ কোটি টাকা
শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য ৩৫.৩৭ টাকা ৪১.৫১ টাকা
পুরো বছরের মুনাফা ১,৩২৪ কোটি টাকা (২০২৫) প্রযোজ্য নয়

সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সিটি ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলে মুনাফা, সম্পদ, আমানত ও শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্যের প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে আয় এবং ঋণের সুদ আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমানতের সুদ ব্যয় তুলনামূলক কম বাড়ায় ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতায় শুধু মুনাফা বা সম্পদের পরিমাণ দিয়ে একটি ব্যাংকের সামগ্রিক সক্ষমতা বিচার করা যথেষ্ট নয়। ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণের হার, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের আস্থার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব সূচকে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে সিটি ব্যাংকের জন্য সামনের দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।