আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম ৮ মার্চ যেন এক বর্ণিল উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৬ রানের দাপুটে জয়ের পর ভারতীয় ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাসে ভেসে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। মাঠজুড়ে আনন্দ উদযাপনে অংশ নেন দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার, বিশেষ করে সূর্যকুমার যাদব ও হার্দিক পান্ডিয়া। তবে সেই উদযাপনের এক মুহূর্তই পরে বিতর্কের জন্ম দেয়। ভারতের জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে উদযাপন করতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া। অভিযোগ উঠেছে, তিনি জাতীয় পতাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে পতাকা অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত উদযাপনের সময় ধারণ করা কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। তাতে দেখা যায়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল জয়ের উচ্ছ্বাসে পান্ডিয়ার পিঠে ভারতীয় পতাকা বাঁধা ছিল। এক পর্যায়ে তিনি সেই পতাকা জড়িয়েই মোদি স্টেডিয়ামের ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েন। এই দৃশ্যই পরে বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকের মতে, জাতীয় পতাকার প্রতি এমন আচরণ শোভন নয় এবং এটি দেশের প্রতীকী মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পুনের আইনজীবী ওয়াজিদ খান এ ঘটনায় সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেন। তিনি পুনের শিবাজি নগর থানায় হার্দিক পান্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা ১১ মার্চ গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগটি এফআইআর প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আইনজীবী ওয়াজিদ খানের দাবি, জাতীয় পতাকা কোনো ব্যক্তিগত পোশাক বা বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি দেশের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক।
ওয়াজিদ খান অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, উদযাপনের সময় পান্ডিয়া তার বান্ধবীর সঙ্গে নাচছিলেন এবং তখন তার পিঠে জাতীয় পতাকা বাঁধা ছিল। তিনি বলেন, “উদযাপনের উচ্ছ্বাসে পান্ডিয়া জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন। আমার মতে এটি জাতীয় পতাকার মর্যাদার প্রতি অবমাননাকর আচরণ।”
প্রথমদিকে শিবাজি নগর থানার পুলিশ অভিযোগটি গ্রহণ করতে অনীহা দেখায় বলে জানান ওই আইনজীবী। তাদের যুক্তি ছিল, ঘটনাটি পুনেতে ঘটেনি; তাই এখানকার থানায় অভিযোগ গ্রহণের প্রশ্ন ওঠে না। তবে ওয়াজিদ খান পাল্টা যুক্তি দেন, জাতীয় পতাকা সমগ্র দেশের প্রতীক, তাই দেশের যেকোনো স্থানের নাগরিকই এ বিষয়ে অভিযোগ করতে পারেন। পরে পুলিশ তার লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে এবং একটি কপি তাকে প্রদান করে।
ভারতের জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিষয়ে ১৯৭১ সালের “প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার অ্যাক্ট” বা জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইনে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এই আইনের ধারা অনুযায়ী জাতীয় পতাকা অবমাননা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভারতীয় ক্রিকেটে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে উদযাপনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে বার্বাডোজে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ের পর ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে উদযাপন করেছিলেন। সেই মুহূর্তটি ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আবেগঘন স্মৃতি হয়ে রয়েছে। ওই ম্যাচের পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন রোহিত ও কোহলি।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় পান্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল কারণ হলো পতাকা গায়ে জড়িয়ে মাঠের ঘাসে শুয়ে পড়ার দৃশ্যটি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—কেউ এটিকে নিছক আনন্দ উদযাপন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ জাতীয় প্রতীকের প্রতি অসম্মান বলেই মনে করছেন।
নিচে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ম্যাচের তারিখ | ৮ মার্চ |
| ভেন্যু | নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম, আহমেদাবাদ |
| প্রতিপক্ষ | নিউজিল্যান্ড |
| ফলাফল | ভারত ৯৬ রানে জয়ী |
| অভিযোগকারী | আইনজীবী ওয়াজিদ খান |
| অভিযোগের ধরন | জাতীয় পতাকা অবমাননা |
| অভিযোগ দায়েরের স্থান | শিবাজি নগর থানা, পুনে |
আইনি প্রক্রিয়া এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী ধরনের তদন্ত শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—জাতীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।



