খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে আহসান এইচ মনসুরের নাম সবচেয়ে সমালোচিত গভর্নরের তালিকায় সর্বাধিক উচ্চশ্রেণীতে অবস্থান করছে। সাবেক এই গভর্নরের দায়িত্বকালে ব্যাংকের কর্মকর্তারা একধরনের স্বৈরশাসনের শিকার হন বলে তারা অভিমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিদায়ের দুই সপ্তাহের মধ্যেই ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সাধারণত শান্তিপ্রিয় ও পেশাদার। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হওয়ায় তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (KPI)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, আহসান এইচ মনসুরের পদকালের সময় ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছিল। কর্মকর্তারা তার একগুঁয়েমি ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। বিদায়ের দিনে তাঁকে কার্যত গলা ধাক্কা দিয়ে ব্যাংকের বাইরে বের করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত পরিচালক নেতৃত্ব দিয়ে তাঁকে গাড়িতে তোলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে মোট ৯টি ক্লাব ও সমিতি রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
| ক্লাব / সমিতি | সদস্যের ধরন |
|---|---|
| বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল | সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা |
| অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন | ক্যাশ অফিসাররা |
| বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব | সকল ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী |
এগুলো আহসান মনসুরের সময়ের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “আহসান মনসুর কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকেরই ক্ষতি করেননি, গোটা ব্যাংকিং সিস্টেম এবং দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন।”
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার উদাহরণ প্রথম ঘটে ১৯৯৬ সালে। তৎকালীন গভর্নর খোরশেদ আলমকে ঘেরাও করা হয়, এবং নতুন গভর্নর লুৎফর রহমানকে দায়িত্ব নিতে আসার সময় সাবেক গভর্নরের নিরাপদ বহির্গমনে সতর্কতা নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে, সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালে দায়িত্বকালীন সময়ে কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। তবে এ ধরনের গণদুশমন বা বিদায়ের সময় প্রকৃত অসন্তোষের মাত্রা আহসান মনসুরের সময়ের মতো তীব্র ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন যে আহসান মনসুর:
ব্যাংকের নিয়মনীতি ও নিয়োগ নীতি উপেক্ষা করেছেন
চুক্তিভিত্তিক ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন
কর্মকর্তাদের মান ও মনোবল নষ্ট করেছেন
গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি আটকে রেখেছেন
ব্যাংকের প্রশাসনিক পরিবেশকে অস্থির করেছেন
তাদের মতে, গত ১৮ মাসে এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহ্য এবং কার্যকারিতা ভঙ্গ করেছে। কর্মকর্তা ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু আহসান মনসুর স্বৈরশাসন শুরু করেছিলেন, যা আমরা মেনে নিতে পারিনি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত, ঘৃণিত এবং ধিক্কৃত গভর্নর হিসেবে স্মরণীয় থাকবেন। তাঁর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ব্যাংকের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম আটকে গেছে, এবং ব্যাংকিং খাতের নীতি ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মনে করেন, তাঁর বিদায় ব্যাংকের ঐতিহ্য, স্বায়ত্তশাসন এবং পেশাদারিত্বের প্রতি পুনরায় আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।