স্মরণে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলা নবজাগরণের আলোকিত পরিসরে এক অনন্য দীপ্তিমান নাম জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর—নাট্যকার, গীতিকার, সঙ্গীতজ্ঞ, অনুবাদক, চিত্রশিল্পী ও সংগঠক—একজন সত্যিকারের বহুমাত্রিক প্রতিভা।
১৮৪৯ সালের ৪ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর পঞ্চম পুত্র এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অগ্রজ। শৈশব থেকেই সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার এক উর্বর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি।
১৮৬৮ সালে কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ—এই সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথের জীবনেও গভীর আবেগময় ছাপ ফেলে। অনেকে মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের “নষ্টনীড়” গল্পের চারুলতা-অমল চরিত্রে সেই আবেগের প্রতিফলন রয়েছে।
জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ১৮৬৭ সালে কলকাতার প্রথম ‘হিন্দুমেলা’র সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। এ উপলক্ষে তাঁর রচিত ‘উদ্বোধন’ কবিতা দেশপ্রেমের এক অনন্য নিদর্শন। তিনি ‘ব্রাহ্মধর্মবোধিনী সভা’, ‘সারস্বত সমাজ’, ‘সঞ্জীবনী সভা’ প্রভৃতি সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবন শুরু হয় নাট্যরচনার মাধ্যমে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে—
কিঞ্চিৎ জলযোগ (প্রহসন)
পুরুবিক্রম
সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ
অশ্রুমতি
স্বপ্নময়ী
হঠাৎ নবাব (প্রহসন)
অলীক বাবু (প্রহসন)
তাঁর নাটকে যেমন স্বদেশপ্রেম ও ইতিহাসচেতনা প্রবল, তেমনি প্রহসনে সমাজের অসংগতি নিয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ বিদ্যমান। পাশাপাশি তিনি সংস্কৃত, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষা থেকে বহু নাটক বাংলায় অনুবাদ করে সাহিত্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি শুধু গান রচনা করেননি, সুরারোপ ও স্বরলিপি প্রণয়নে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর ‘স্বরলিপি গীতিমালা’ গ্রন্থটি আজও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেতার, পিয়ানো ও বেহালা বাজনায় পারদর্শী ছিলেন এবং পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সঙ্গীতের সুরমিলনে ছিলেন অগ্রদূত।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতজীবনের সূচনায়ও তাঁর প্রভাব ছিল গভীর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সুরে অনেক সময় রবীন্দ্রনাথ, অক্ষয় চৌধুরী ও স্বর্ণকুমারী দেবী গান রচনা করতেন। সঙ্গীতের ছন্দ ও সুরবোধে কিশোর রবীন্দ্রনাথকে তিনিই প্রথম সচেতন করে তোলেন।
ব্রাহ্মধর্মের আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসঙ্গীত রচনাতেও বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর রচিত ৬১টি ব্রাহ্মসঙ্গীত আজও সংকলিত আকারে সংরক্ষিত। তিনি ‘ভারত সঙ্গীত সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে সংগীতচর্চাকে সংগঠিত রূপ দেন।
শিল্পী হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য—বিশেষত প্রতিকৃতি অঙ্কনে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়।
১৯২৫ সালের ৪ মার্চ রাঁচিতে এই বহুমুখী প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলো আজও বাংলা সংস্কৃতির আকাশে দীপ্ত হয়ে আছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর—একজন মানুষ নন, এক সমগ্র সাংস্কৃতিক যুগের প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্মৃতি আমাদের প্রেরণা জোগায়, পথ দেখায়—সৃজন, মনন ও স্বদেশপ্রেমের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।