এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত এক উজ্জ্বল নাম—ড. এম আখলাকুর রহমান। তিনি শুধু একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদই নন, ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী এবং সমাজসচেতন এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
১৯২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটির শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাত্র তিন বছর বয়সে, পিতার পরিচালিত পাঠশালায়। পরবর্তীতে বালাগঞ্জ ও হবিগঞ্জে স্কুলশিক্ষা শেষে সিলেটের মদনমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন।
মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি পাড়ি জমান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়-এ, সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অর্থনীতিতে এমএ সম্পন্ন করে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
গবেষণার টানে তিনি ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার-এ রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। এরপর পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়-এ শিক্ষকতা করেন এবং Pakistan Economic Journal-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
পরবর্তীতে করাচির পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্স-এ জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশে ফিরে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থনীতি ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি তাঁকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে।
ড. আখলাকুর রহমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনও ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ী।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করেও আটকে পড়া বাঙালিদের সহায়তায় অর্থসংগ্রহের উদ্যোগ নেন—যা তাঁর মানবিকতা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী এই মানুষটি কখনোই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেননি। কর্মজীবনে নানা বাধা, এমনকি কারাবরণও তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
মানবসেবায় তাঁর অঙ্গীকার ছিল অনন্য। কিশোর বয়সে বানিয়াচংয়ে ম্যালেরিয়ার মহামারীতে তিনি যে সাহসিকতা ও মানবিকতার পরিচয় দেন—তা তাঁর সারাজীবনের পথচলার প্রতিচ্ছবি। নিজে আক্রান্ত হয়েও মানুষের পাশে থাকার এই মানসিকতা তাঁকে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আধ্যাত্মিক জীবনেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে অনুরাগী। ১৯৭৪ সাল থেকে শহীদ আল বোখারীর সংস্পর্শে এসে যোগ ও ধ্যানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং ১৯৮৩ সালে যোগ মেডিটেশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯২ সালের ৪ মে এই মহান ব্যক্তিত্ব ইহলোক ত্যাগ করেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
ড. আখলাকুর রহমান—একজন আলোকিত মানুষ, যিনি জ্ঞান, নীতি ও মানবিকতার সমন্বয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্য ও আদর্শে অবিচল থাকাই মানুষের সর্বোচ্চ শক্তি।