খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জার্মানির পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল ইরানকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে বার্লিন মনে করে।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অভিন্ন। তিনি মার্কিন রাজনীতিক মার্কো রুবিওর বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বলেন, ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরে আসতে হবে। এ ছাড়াও, বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ওপর তিনি জোর দেন।
ইসলামাবাদ সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াডেফুল ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনায় বসার পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সংকট নিরসনে সংলাপই একমাত্র কার্যকর পথ। ইরানের জনগণের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবসমূহ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য তিনি তেহরানকে অনুরোধ জানান।
ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প ইউরোপের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছেন:
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় দেশগুলো যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। বিশেষ করে ন্যাটো জোটকে ইরান ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি এমনকি হুমকি দিয়েছেন যে, ন্যাটোর সমর্থন না পেলে যুক্তরাষ্ট্র এই জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে জার্মানি এই চাপের মুখেও তাদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখেছে। গত মার্চ মাসে ওয়াডেফুল স্পষ্ট করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালি রক্ষায় জার্মানি ন্যাটোর সরাসরি কোনো ভূমিকা দেখছে না।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত ২৭ এপ্রিল উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ইরান সংকটে ওয়াশিংটনের কোনো সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা সংকট থেকে বের হওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। মের্ৎসের মতে, ইরান কূটনৈতিক আলোচনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব ও অবস্থান অনেকের ধারণার চেয়েও শক্তিশালী।
তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, বরং তাদের আঞ্চলিক শক্তির বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। জার্মানি মনে করে, কৌশলগত অস্পষ্টতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর জার্মানি তাদের অবস্থান কঠোরভাবে পরিষ্কার করেছে। বার্লিন সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে: ১. জার্মানি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না। ২. বাইরের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানে কোনো ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে জার্মানি সমর্থন করবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডেফুল বলেন, জার্মানি অবশ্যই ইরানে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ দেখতে চায়, তবে সেই পরিবর্তন হতে হবে দেশটির অভ্যন্তরীণ জনগণের ইচ্ছায়। বাইরের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা সামরিক অভিযান সেখানে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারবে না বলে জার্মানি বিশ্বাস করে। যদিও জার্মানি ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং জনগণের ওপর দমন-পীড়নের কঠোর নিন্দা জানিয়ে আসছে, তবুও দেশটির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার পক্ষে তারা অনড়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে বা সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করে, এই পথটি অবরুদ্ধ থাকা মানে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তাই জার্মানি ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যাতে তারা কোনোভাবেই এই পথটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন না করে।
পরিশেষে, জার্মানির বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি মূলত একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কৌশলগত মিত্রতা বজায় রেখে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে তারা ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপ বা জবরদস্তিমূলক শাসন পরিবর্তনের নীতির বিরোধিতা করে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খুঁজছে। জার্মানির এই স্বতন্ত্র অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।