খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও এর সুফল সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার প্রতি মণ ধানের দাম ১,৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা সেই মূল্যের অর্ধেক অর্থাৎ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হানা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান এই শস্যভাণ্ডারের কৃষকদের।
গত কয়েকদিনের টানা অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল তলিয়ে গেছে। প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে কৃষকরা কিছু পরিমাণ ধান কাটতে সক্ষম হলেও বর্তমানে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ধান শুকানো। হাওরাঞ্চলে ধান মাড়াইয়ের পর তা শুকানোর জন্য উন্মুক্ত মাঠ বা ‘খলা’ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রোদের অনুপস্থিতি এবং গুমোট আবহাওয়ার কারণে খলায় রাখা ভেজা ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে। বৃষ্টির পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজে থাকায় ধানের গুণগত মান ও রঙ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে ধানের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে গুণগত মান হারানো এই ধান নিয়ে কৃষক চরম বিপাকে পড়েছেন।
হাওরাঞ্চলে ধান কাটার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শ্রমিকদের মজুরি একটি বড় অংকের ব্যয়। বর্তমানে কৃষকদের হাতে নগদ অর্থের তীব্র সংকট রয়েছে। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর তাগিদে কৃষকরা ধান শুকানোর অপেক্ষা করতে পারছেন না। বাধ্য হয়েই তারা পানির দরে অর্থাৎ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে ভেজা ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন। কৃষকদের অভিযোগ, এই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থাকে পুঁজি করে স্থানীয় কিছু পাইকার এবং শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা কৃষকের নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেকেরও কম দামে ধান হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, বরং প্রতিটি মণে তাদের বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৩ মে (রবিবার) থেকে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা খাদ্য বিভাগ। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সুনামগঞ্জ জেলা থেকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে মোট ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা এবং প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বি.এম মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি এই ধান কেনা হবে যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পান।
সরকারি এই মহৎ উদ্যোগের সুফল নিয়ে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক শঙ্কা ও সংশয় কাজ করছে। তাদের মতে, সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আর্দ্রতা বা শুকানোর যে মানদণ্ড থাকে, বর্তমান আবহাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান নিয়ে গেলেও তা মানোত্তীর্ণ না হওয়ার অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সুযোগটিই গ্রহণ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা, যারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে পরে তা শুকিয়ে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে মুনাফা লুটে নেয়।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার কৃষকদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সরাসরি তাদের কাছ থেকে ধান কেনা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় যাতে কোনোভাবেই সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগী প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষকদের ভাষ্যমতে, যদি সরাসরি প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে সরকার ধান সংগ্রহ না করে, তবে ১,৪৪০ টাকা দরের এই সুবিধা কেবল অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটেই যাবে, আর কৃষক বরাবরের মতোই বঞ্চিত থেকে যাবে।