খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত কক্ষে মাদক সেবনের সময় হাতে-নাতে ছয়জন যুবককে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গত রবিবার (৩ মে) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামস্থ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে এমন অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টি জনসমক্ষে আসায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কালাই উপজেলার চেচুরিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিয়মিত মাদকের আসর বসছে—এমন একটি সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সংস্থাটির একটি চৌকস দল সেখানে অভিযান চালায়। অভিযান পরিচালনাকালে কর্মকর্তারা দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত থাকা ওই ভবনের একটি কক্ষে মাদক সেবনরত অবস্থায় ছয়জনকে দেখতে পান। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সকলকে আটক করা হয়।
আটককৃত ব্যক্তিরা হলেন:
পুরগ্রামের খলিল মিয়ার পুত্র লাল্টু মিয়া (২৬)
একই এলাকার মৃত মিনা হোসেনের পুত্র তৌহিদ হোসেন (২৮)
জমিনপুর গ্রামের মিলন হোসেনের পুত্র আব্দুল আজিজ (২২)
লওনা গ্রামের সামছুল মিয়ার পুত্র হাসান মিয়া (২২)
গঙ্গা দাসপুর গ্রামের মনতাজ আলীর পুত্র শফিকুল ইসলাম (২৫)
ঝামুটপুর গ্রামের শামসুদ্দিনের পুত্র জিয়াউর রহমান (৪০)
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, চেচুরিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রায় ১৫ বছর আগে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নানা সংকটে নিমজ্জিত ছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কম থাকা এবং সরকারি এমপিওভুক্তি (Monthly Pay Order) লাভে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যালয়টি তার স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সংস্কার বা প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় বিদ্যালয়ের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। প্রায় দেড় দশক ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় থাকায় এবং মূল বসতি এলাকা থেকে কিছুটা বিচ্ছন্ন স্থানে অবস্থান হওয়ায় এটি মাদকসেবী ও বখাটেদের জন্য একটি নিরাপদ গোপন আস্তানা হিসেবে গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের আলোর তুলনায় সন্ধ্যার পর সেখানে বহিরাগত ব্যক্তিদের আনাগোনা বহুগুণ বেড়ে যেত।
বিদ্যালয়টি পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকেই সেখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল বলে গ্রামবাসী দাবি করেছেন। যদিও বিষয়টি আশপাশের বাসিন্দারা জানতেন, তবুও মাদকসেবীদের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাবে কেউ দীর্ঘকাল মুখ খুলতে সাহস পাননি।
ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় উদয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বেলাল হোসেন বলেন, “বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেই। ফলে এটি জনমানবহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সাথে সাথেই সেখানে মাদকসেবীদের তৎপরতা শুরু হতো, যা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এমন পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানটি সময়োপযোগী ছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
অভিযান শেষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আটকদের কাছে মাদক সেবনের সরঞ্জামাদি ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। তারা সরাসরি অপরাধ সংগঠনের সময় আটক হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আটককৃত ছয়জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশ্লিষ্ট ধারায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। জয়পুরহাট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের বিজ্ঞ আদালতে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
জয়পুরহাট জেলায় মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা পরিত্যক্ত এলাকাগুলো যেন মাদকের অভয়ারণ্য না হতে পারে, সে লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কালাই উপজেলার এই ঘটনাটি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরিত্যক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ভবনগুলো যথাযথ তত্ত্বাবধানে না থাকলে তা অপরাধীদের আশ্রয়ে পরিণত হয়। সচেতন মহল মনে করছেন, বিদ্যালয়ের ভবনটি সংস্কার করে অন্য কোনো গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা অথবা প্রশাসনিক কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করাই হবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।