খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় পাথরবোঝাই ট্রাক ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের বাবা-মেয়েসহ মোট ৫ জন নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নাগেশ্বরী পৌরসভার বাঁশেরতল এলাকায় কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। রংপুর থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের এই খবরটি ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে পৌঁছালে সেখানে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি আরও ৯ জন গুরুত্বর আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নিহত ও আহতরা সবাই কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে তারা একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে গিয়েছিলেন। সারাদিন চিকিৎসা শেষে রাতে তারা নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে নাগেশ্বরীর বাঁশেরতল এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি পাথরবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সরাসরি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই ৩ জন প্রাণ হারান। পরবর্তীতে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়।
নিহত ৫ জন হলেন: ১. শামীম হোসেন (৩২): ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আসাদ মোড় এলাকার বাসিন্দা। ২. সাদিয়া আক্তার (৮): নিহত শামীম হোসেনের কন্যা। ৩. তামান্না আক্তার (২৮): একই পরিবারের বাবু মিয়ার স্ত্রী। ৪. নুরনবী মিয়া (২৮): জাহিদুল ইসলামের পুত্র। ৫. লিমন মিয়া (২৮): ধলডাঙ্গা গ্রামের সাইফুর রহমানের পুত্র এবং মাইক্রোবাসের চালক।
নিহতদের মরদেহ বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বিশেষ করে একই পরিবারের বাবা ও মেয়ের অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৯ জন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন: হামিদুল ইসলাম (২৫), শান্তা (২০), সমের আলী (৬০), জবা (৩৫), বাবু মিয়া (৪২), মনির মিয়া (৪৫), মুন মিয়া (১০), শিউলি বেগম (৪০) এবং সিয়াম মিয়া (৩৫)। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের কয়েকজনের আঘাত অত্যন্ত গুরুতর, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার বিষয়ে শিলখুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কোরবান আলী বাবু জানান, এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে গেছে। একই এলাকা থেকে চিকিৎসার জন্য গিয়ে ৫ জন মানুষের লাশ হয়ে ফিরে আসা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য তারা তদারকি করছেন।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন ৪ জনের মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যেহেতু ঘটনাস্থল নাগেশ্বরী থানার আওতাধীন, তাই পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম সেখান থেকেই পরিচালিত হবে।
নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ হিল জামান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতক ট্রাকটিকে আটক করেছে। তবে ট্রাকের চালক ও সহকারী দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশ ঘাতক চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কের এই অংশটিতে প্রায়শই দ্রুতগামী ট্রাকের কারণে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে পাথরবোঝাই ট্রাকগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করায় এই ধরণের প্রাণহানি ঘটছে। রংপুরের মতো দূরবর্তী স্থানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সাধারণ মানুষদের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিকরা। একই সাথে পলাতক ট্রাক চালককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতদের পরিবার।
বুধবার বিকেলে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে নিহতদের দাফন সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।