খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে শৈশবের প্রিয় আঙিনায় ফিরেছিলেন নেইমার জুনিয়র। তবে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোসে তাঁর দ্বিতীয় অধ্যায়টি রূপ নিচ্ছে চরম নাটকীয়তা ও হতাশায়। মাঠের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতাহীনতা, গভীর অর্থনৈতিক সংকট এবং ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে ক্লাব ব্যবস্থাপনার শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি—সব মিলিয়ে সান্তোসে ৩৪ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলছে চরম অনিশ্চয়তায়।
ব্রাজিলিয়ান ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমগুলোর দীর্ঘ অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, ক্লাব ও খেলোয়াড়—দুই পক্ষের অভ্যন্তরীণ তিক্ততা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নেইমারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়।
ব্রাজিলের প্রভাবশালী ক্রীড়া মাধ্যম ‘জি গ্লোবো’-র এক বিশদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সান্তোসের ড্রেসিংরুম ও ম্যানেজমেন্টের ভেতরে নেইমারের দৈনন্দিন আচরণ নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ক্লাবের ভেতরের পরিবেশ এবং প্রাত্যহিক কার্যক্রমে তাঁকে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর কিছু স্বার্থপর সিদ্ধান্ত ও আচরণ সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং কর্মকর্তাদের চরম বিরক্ত করেছে। গত মে মাসে অনুশীলনের সময় তরুণ খেলোয়াড় রবিনহো জুনিয়রের সঙ্গে একটি বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার পর দলেও তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে।
মাঠের বাইরের ঘটনাগুলো এই বিতর্কের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে। সান্তোস যখন দক্ষিণ আমেরিকান প্রতিযোগিতা কোপা সুদামেরিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে ভেনিজুয়েলা সফরে ছিল, তখন চোটের কারণে দলে না থাকা নেইমারকে সাও পাওলোর একটি পোকার টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। পরবর্তীতে শাপেকোয়েন্সের বিরুদ্ধে গোল করার পর পোকার খেলায় কার্ড বাঁটার ভঙ্গিতে উদযাপন করে সমালোচকদের যেন একহাত নেন এই তারকা।
এত বিতর্কের মাঝে নেইমার নিজেও পেশাদার ফুটবলের রুটিন জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন। জি গ্লোবোর দাবি অনুযায়ী, তিনি ক্লাবের প্রতিদিনের অনুশীলনের কঠোর রুটিন নিয়ে বিরক্ত এবং পেশাদার ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানানোর কথা ভাবছেন। তবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি ও আর্থিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁর বাবা ও এজেন্ট তাঁকে চুক্তি শেষ হওয়া পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে মানসিক চাপ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, নেইমারের ঘনিষ্ঠজনরাও সান্তোস কর্তৃপক্ষের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে, ক্লাবের ফুটবল বিভাগের প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং বাইরের মানুষের অবাধ আনাগোনা পরিবেশ নষ্ট করছে। পাশাপাশি ক্লাবটির অবকাঠামোগত মান অত্যন্ত বাজে। যে দল টানা দ্বিতীয় বছরের মতো রেলিগেশন বাঁচানোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে নেইমারের মতো তারকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা কঠিন। এমনকি ক্লাবের ট্রেনিং সেন্টার এবং ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামের প্রাথমিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নেইমার নিজের পকেট থেকেও অর্থ ঢেলেছেন বলে জানা গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সান্তোসের বিশাল আর্থিক বকেয়া। ব্রাজিলিয়ান মিডিয়ার দাবি, নেইমারের ইমেজ রাইটস ও অন্যান্য বকেয়া বাবদ সান্তোসের কাছে তাঁর পাওনা ১৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ক্লাবের আর্থিক সংকট এতটাই তীব্র যে টানা তিন মাস খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে সম্প্রতি তাদের একাডেমি তারকা লুকা মেইরেলেসকে ইউক্রেনীয় ক্লাব শাখতার দোনেৎস্কে বিক্রি করতে বাধ্য হয় সান্তোস। সেই ট্রান্সফার থেকে পাওয়া অর্থ থেকে ১.৫ মিলিয়ন ডলার নেইমারের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এনআর স্পোর্টসকে পরিশোধ করে কিছুটা বকেয়া চুকিয়েছে ক্লাবটি।
সর্বশেষ শাপেকোয়েন্সের বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র করা ম্যাচের বিরতিতে ড্রেসিংরুমে সতীর্থ গ্যাব্রিয়েল বোন্তেম্পো ও জোয়াও আনানিয়াসের সঙ্গে নেইমার উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন বলেও খবর চাউর হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ১০ নম্বর জার্সিধারী এই ব্রাজিলিয়ান।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে নেইমার লেখেন, “পুরোটাই বানোয়াট মিথ্যা। যে বা যারা এই খবর ছড়িয়েছে, দয়া করে এসব অপপ্রচার বন্ধ করুন। ড্রেসিংরুমে উপস্থিত যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সত্য জানা যাবে। সেটা ছিল স্রেফ একটা স্বাভাবিক দলীয় কৌশলগত আলোচনা। আমি কথা বলেছি, লুকাস বলেছে, আরাও, গ্যাবি—আমরা সবাই কথা বলেছি। আমরা সবাই জয় পেতে উন্মুখ ছিলাম, তাই আলোচনার সুর কিছুটা জোরালো হতেই পারে। কিন্তু কোনো তরুণ খেলোয়াড়কে গালিগালাজ বা অপমান করার মতো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সেখানে ঘটেনি।”
মাঠ ও মাঠের বাইরের একের পর এক ঘটনায় সান্তোস এবং নেইমারের বহুল আলোচিত রূপকথা এখন বিষাদময় সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যস্থতায় বরফ গলে কি না, নাকি চরম তিক্ততা ও মানসিক দূরত্ব নিয়েই ঘরের ছেলেকে বিদায় জানাতে হয় সান্তোসকে—তা সময়ই বলে দেবে।