খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ময়মনসিংহে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে কবির হোসেন রুবেল মিয়া (৩৫) নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। দীর্ঘ নয় বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলার সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ আদালত এই দৃষ্টান্তমূলক রায়ের ঘোষণা দেন। ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ঘটনা ঘটল।
মামলার নথিপত্র এবং রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির প্রদানকৃত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট। ওই দিন সন্ধ্যার পর ভুক্তভোগী আট বছর বয়সী শিশুটি তার নিজ বাড়িতে ফিরছিল। পথিমধ্যে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন রুবেল মিয়া শিশুটির গতিরোধ করেন। রুবেল মিয়া পেছন থেকে শিশুটির মুখ চেপে ধরেন এবং একটি ধারালো চাকু প্রদর্শন করে তাকে হত্যার ভয় দেখান।
পরবর্তীতে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তিনি শিশুটিকে নগরীর একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান এবং সেখানে তাকে ধর্ষণ করেন। পৈশাচিক এই কর্মকাণ্ড শেষে রুবেল মিয়া শিশুটিকে সতর্ক করে দেন যে, এই ঘটনার কথা কাউকে বললে তাকে মেরে ফেলা হবে। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটি কোনোক্রমে বাড়ি ফিরে আসে। তার শারীরিক অবস্থা দেখে পরিবারের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করলে শিশুটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে।
ঘটনার পর পরই ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তীতে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলা এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রত্যক্ষদর্শীসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার আসামির উপস্থিতিতে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়:
প্রধান সাজা: আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হলো।
আর্থিক দণ্ড: কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অনাদায়ে সাজা: জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিকে অতিরিক্ত ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামি কবির হোসেন রুবেল মিয়া কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় প্রদান শেষে সাজা পরোয়ানা মূলে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মজিবুর রহমান এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, অপরাধের গুরুত্ব এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই রায়ের ফলে সমাজে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে এবং শিশুদের ওপর সহিংসতা হ্রাসে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ময়মনসিংহের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এটিই প্রথম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ঘটনা। সাধারণত এই ধরণের সংবেদনশীল মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক সময় বিচার দীর্ঘায়িত হয় কিংবা আসামিরা পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় বিচারক সর্বোচ্চ এই সাজার আদেশ দেন।
৯ বছর আগে সংঘটিত এই নির্মম ঘটনার বিচার সম্পন্ন হওয়ায় ভুক্তভোগীর পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। ময়মনসিংহের এই রায়টি শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।