খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি। এই আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের বিপরীতে ইরান কর্তৃক প্রস্তাবিত নতুন ‘টোল’ বা মাশুল প্রদানের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ। গত মঙ্গলবার সৌদি আরবের জেদ্দায় আয়োজিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সদস্য দেশগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
জেদ্দায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান—ইরানের প্রস্তাবিত শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহামেদ আলবুদাইউই এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলপথ এবং এর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে এককভাবে কোনো দেশের অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নেই। জিসিসি ও এর সদস্য দেশগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এ ধরনের কোনো অবৈধ মাশুল বা অর্থ পরিশোধ করবে না। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও কনভেনশন অনুযায়ী এই জলপথে নিরবচ্ছিন্ন জাহাজ চলাচলের অধিকার রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেহরান সাময়িকভাবে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। সে সময় ইরানের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ এই জলপথে প্রবেশ করলে তাতে হামলা চালানো হতে পারে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করলেও নতুন কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দেয়। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়:
এই প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ মার্কিন ডলার হারে টোল প্রদান করতে হবে।
জলপথে প্রবেশের পূর্বে ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।
এই দুই শর্তকেই আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল আইনের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে জেদ্দার বৈঠকে তা প্রত্যাখ্যান করেছে জিসিসি।
প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার (১০৪ মাইল) দীর্ঘ হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই প্রণালির উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। এর গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার মূল কারণগুলো হলো:
১. জ্বালানি সরবরাহ: বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ২. এলএনজি রপ্তানি: কাতার থেকে বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সিংহভাগই এই প্রণালি দিয়ে যায়। ৩. আন্তর্জাতিক বাজার: হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরণের অস্থিরতা বা চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার সংবাদ মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলপথে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের অধিকার সকল দেশের রয়েছে। যেহেতু হরমুজ প্রণালি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসীমাকে যুক্ত করেছে, তাই এখানে একক কোনো দেশের আধিপত্য বা শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
জিসিসি দেশগুলোর এই সরাসরি প্রত্যাখ্যানে তেহরান কী ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। যদি ইরান জোরপূর্বক টোল আদায়ের চেষ্টা করে বা জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে পারস্য উপসাগরে মোতায়েনকৃত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জেদ্দায় গৃহীত এই সিদ্ধান্ত মূলত ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে জিসিসিভুক্ত আরব রাষ্ট্রগুলোর একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক বার্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির উন্নয়ন বা অবনতি আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।