খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৩৩ পিএম
দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সরকারের বর্তমান সক্ষমতা সীমিত বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো বিকল্প নেই।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অনলাইনে যুক্ত হয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব, শিল্প খাতের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত উঠে আসে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে যে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে, সেটিও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সচল না থাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ শেষ না করা পর্যন্ত সরকারের মূল কাজ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ যতটা সম্ভব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা, যাতে শিল্প খাতে তুলনামূলক বেশি গ্যাস দেওয়া যায় এবং লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
মন্ত্রী জানান, টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই বর্তমান সংকটের সূত্রপাত। মেরামতের কাজে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা যুক্ত রয়েছেন। মেরামত শেষ হওয়ার পর নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করার প্রয়োজন হবে। সে সময় কারিগরি সমন্বয়ের জন্য পুরো ব্যবস্থাকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হতে পারে। ফলে টার্মিনাল পুনরায় চালুর প্রক্রিয়াতেও সাময়িকভাবে গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান সংকটের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলায় ২০২৯ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। মন্ত্রী জানান, নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জন্য ইতোমধ্যে আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস শিল্পকারখানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০টি ট্রাক পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনটেইনারের মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরিতে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ রাতে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুতের চাহিদার প্রচলিত সময়সূচিতে পরিবর্তন ঘটছে এবং রাতের দিকে ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। তাঁর হিসাবে, সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে।
অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও তিনি জানান। ফলে চাহিদা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা একটি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেলের সরবরাহ নিয়েও গুজব সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া তেল ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। বরং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তেল আমদানির সুযোগ তৈরির জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা জানান তিনি। এ খাতকে উৎসাহিত করতে পাঁচ বছরের করছাড় সুবিধাও দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
সংলাপে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব তুলে ধরেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তিনি বলেন, সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ক্ষতির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের কিস্তি ও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন অর্ডার হারানোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শিল্প খাতকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা বা উদ্ধার প্যাকেজের দাবি জানান তিনি।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির বলেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত একই সঙ্গে চাপে পড়ে। আমদানিনির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করে।
সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়। আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্য ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলা এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক নীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নিলে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন অন্তত ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বাস্তবভিত্তিক বাজারনীতি।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে যথাযথ মূল্যনীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির ঘাটতি সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে। শিল্প, কৃষি ও সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের বড় একটি অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন। তিনি বন্দরে পণ্য খালাসের প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে শুল্ক সুবিধা এবং বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের পরামর্শ দেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সংকটের জন্য দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, সঠিক মূল্যনীতির অভাব এবং সিস্টেম লসের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর মতে, শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়; বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং অপচয় কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্প উদ্যোক্তা ও সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ, সিস্টেম লস কমানো, সৌরবিদ্যুৎ ও শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থায় কর সুবিধা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান।
মন্ত্রী বলেন, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি জানেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় থেমে থাকে না। তাই বর্তমান সংকট সামাল দিতে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন বলেও তিনি জানান।
সংলাপে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানাসহ সংশ্লিষ্ট খাতের আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বক্তব্য দেন। আলোচনায় উঠে আসে, বর্তমান সংকট শুধু তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঘাটতির বিষয় নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশীয় অনুসন্ধান, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কার্যকর চাহিদা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য